রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মহালানপাড়া গ্রামে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পবিত্র স্থান মাঞ্জহি থান দখল ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার সাঁওতালদের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলামের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
গোদাগাড়ীর রিশিকুল ইউনিয়নের মহালানপাড়া গ্রামে ৩৫টি সাঁওতাল পরিবারের বসবাস। গ্রামের সাঁওতালরা বহু বছর ধরে মাঞ্জহি থানের পাশে প্রায় চার কাঠা জমিতে ধর্মীয় আচার পালন করে আসছেন।
সাঁওতালদের অভিযোগ, সৈয়দপুর গ্রামের ইসমাইল সরকার ও তাঁর ভাই ইব্রাহিম সরকার ওই জায়গা দখলের চেষ্টা করছেন।
মাঞ্জহি থান আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উপাসনার পবিত্র স্থান। গ্রামের নির্দিষ্ট স্থানে কোনো পবিত্র গাছকে কেন্দ্র করে এটি গড়ে ওঠে। সেখানে সাঁওতালরা তাঁদের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আচার পালন করেন। এটি সাঁওতালদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ।
জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, মাঞ্জহি থানটি ২৪ নম্বর দাগে অবস্থিত। এর পাশে ইসমাইল সরকার ক্রয়সূত্রে ৫৯ নম্বর দাগের চার বিঘা জমির মালিক। মাঞ্জহি থানের জমি আলাদা বেড়া দিয়ে ঘেরা ছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত সোমবার ইসমাইল সরকার ও তাঁর ভাই ইব্রাহিম সরকার ট্রাক্টর দিয়ে মাঞ্জহি থানের জমির বেড়া ভেঙে জমিটি দখলের চেষ্টা করেন এবং সেখানে ভাঙচুর চালান।
ঘটনার সময়ই বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়। পরে তাঁর নির্দেশে কাঁকনহাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ইসমাইল সরকারকে জমি দখলে বাধা দেয়।
পরদিন সাঁওতালদের পক্ষে সুখেন মার্ডি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
মহালানপাড়া গ্রামের সাঁওতালরা জানান, জেলা প্রশাসক তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন যে, মাঞ্জহি থান কেউ দখল করতে পারবে না। এ আশ্বাস পেয়ে তাঁরা আজ বুধবার থেকে আবার মাঞ্জহি থান প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন।
সকালে ওই কাজ পরিদর্শন করেন সেন্টার ফর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব ভলান্টারি অর্গানাইজেশনের (সিসিবিভিও) নির্বাহী প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা সারওয়ার-ই-কামাল এবং মানবাধিকারকর্মী আরিফ ইথার।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সারওয়ার-ই-কামাল বলেন, ‘উপাসনালয় ভাঙচুর কেবল অপরাধ নয়, এটি আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত। প্রশাসনের দেওয়া আশ্বাসের দ্রুত ও দৃশ্যমান বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই।’
আদিবাসী সম্প্রদায়ের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও নিরাপত্তার লড়াইয়ে তাঁদের পক্ষ থেকে আইনি সহযোগিতার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন সারওয়ার-ই-কামাল।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অভিযুক্ত ইসমাইল সরকারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তাঁর স্ত্রী ফোন ধরে জানান, ইসমাইল সরকার কথা বলবেন না।
জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সাঁওতালরা গাছের নিচে একটি পাথর রেখে ধর্মীয় আচার পালন করেন। সেটিই তাঁদের পবিত্র স্থান। ইউএনও এবং পুলিশকে বলে দেওয়া হয়েছে, তাঁরা যেন শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় আচার পালন করতে পারেন। জায়গা কেউ দখলে নিতে পারবে না।
গোদাগাড়ীর ইউএনও ইসরাত জাহান বলেন, মাঞ্জহি থান পুরোপুরি ভাঙেনি। সেটা কোনো স্থাপনাও নয়। তাই আইনি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে যিনি ওই জমি চাষ করতে গিয়েছিলেন, তাঁকে শক্তভাবে বলে দেওয়া হয়েছে, তিনি যেন এ ধরনের কাজ আর না করেন। ভবিষ্যতে একই ঘটনা ঘটালে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।