ঘুড়ি উৎসব, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বিচ ফুটবল, ম্যারাথন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় চলছে দুই দিনব্যাপী পর্যটন কার্নিভ্যাল। উৎসবকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সৈকত ও আশপাশের দর্শনীয় স্থানগুলো। তবে পর্যটকের চাপ বাড়ায় আবাসিক হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে দেখা দিয়েছে কক্ষসংকট। পাশাপাশি কার্নিভ্যালের কিছু আয়োজন ও পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টায় কুয়াকাটার লেম্বুর বন সৈকতে ঘুড়ি উৎসব ও শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। রঙিন ঘুড়িতে বর্ণিল হয়ে ওঠে সৈকতের আকাশ। অন্যদিকে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় শিশুরা রং-তুলির আঁচড়ে সাদা ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নানা নিদর্শন। তাদের সৃজনশীলতায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো আয়োজন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এর আগে সকালে বিচ ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে কার্নিভ্যালের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। দুই দিনব্যাপী এ আয়োজনে রয়েছে বিচ ম্যারাথন, পিঠা উৎসব, পুঁথিপাঠ, বাউল গান, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা, পর্যটনবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, ভলিবল, সেলিব্রিটি বিচ ক্রিকেট, ফ্যাশন শো ও আতশবাজিসহ নানা আয়োজন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীতশিল্পী আরমান আলিফ, হাসান (আর্ক), ঐশীসহ দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীরাও পরিবেশনায় অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই কার্নিভ্যালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা জেসমিন জুঁই এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরী এনডিসিসহ অন্যরা।
পূজার ছুটি শেষ হলেও ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের বিচ কার্নিভ্যালকে কেন্দ্র করে কুয়াকাটায় পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। সমুদ্রের নোনাজলে গোসল, খেলাধুলা ও আনন্দ-উল্লাসে মেতে উঠেছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। কেউ সৈকতের বেঞ্চে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছেন, কেউবা প্রিয়জনের হাত ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সৈকতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অনেকে ছবি তুলে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ধরে রাখছেন।
সৈকতের জিরো পয়েন্ট ছাড়াও তিন নদীর মোহনা, লেম্বুর বন, শুঁটকিপল্লি, ঝাউবাগান, গঙ্গামতি ও লাল কাঁকড়ার চরে পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতি দেখা গেছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের পাশাপাশি বিচ কার্নিভ্যালের নানা আয়োজন পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
উৎসব উপলক্ষে সড়ক ও সৈকত এলাকায় তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন ও এলইডি পর্দা স্থাপনসহ নানা সাজসজ্জা করা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, কার্নিভ্যালের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিতে প্রায় এক লাখ পর্যটক ও দর্শনার্থী নিবন্ধন করেছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ধারণা করছেন, দুই দিনে কুয়াকাটায় পর্যটকের সংখ্যা তিন লাখে পৌঁছাতে পারে।
পর্যটকের চাপ বাড়ায় কুয়াকাটার আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অধিকাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে। ফলে আগাম বুকিং ছাড়া আসা অনেক পর্যটককে কক্ষ পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। পর্যটকদের অভিযোগ, বাড়তি চাহিদার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পণ্য ও সেবার দাম বাড়ানো হয়েছে। চায়ের কাপ ১০ টাকা, ডাব ২৫০ টাকা বিক্রি, ভ্যান ও অটোরিকশার ভাড়া ইচ্ছেমতো নির্ধারণ এবং খাবারের বিল বেশি রাখার অভিযোগ করেছেন তাঁরা। কিছু আবাসিক হোটেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
ঢাকা থেকে আসা দম্পতি মেহেরুন ও নাবিল আয়োজনে দর্শকদের বসার ও অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাঁদের ভাষ্য, এত বড় প্রচার-প্রচারণা ও আয়োজনের তুলনায় দর্শকদের অনুষ্ঠান দেখার ব্যবস্থা যথেষ্ট ভালো হয়নি। জায়গা ছোট হওয়ায় স্টলে ভরে গিয়েছিল এবং বাইরে থেকে অনুষ্ঠান দেখার জন্য প্রজেক্টরের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না।
তবে কুয়াকাটা আবাসিক হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, আবাসিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের অধিকাংশ কক্ষ ইতিমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি পর্যটক আসায় কিছুটা কক্ষসংকট দেখা দিয়েছে। তবে অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত হোটেলগুলোতে নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অ্যাসোসিয়েশনের আওতাভুক্ত নয়—এমন কোনো হোটেল বা রিসোর্ট অতিরিক্ত ভাড়া নিলে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেন তিনি।
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুয়াকাটায় জেলা পুলিশ, থানা-পুলিশ, নৌ পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদাপোশাকে গোয়েন্দা সদস্যদের নজরদারি এবং সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা রক্ষায় ট্রাফিক পুলিশের তৎপরতা রয়েছে।
কুয়াকাটা ট্যুরিস্ট পুলিশের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ, এসআরবি ও গোয়েন্দা সদস্যরা সাদাপোশাকে নজরদারি করছেন। সড়ক ও মহাসড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কুয়াকাটা পৌরসভা ও ট্রাফিক পুলিশও কাজ করছে।’
কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসিন সাদেক বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পৌর প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্যসচিব মো. আরিফুজ্জামান বলেন, পর্যটকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অন্যায় আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমন বিবেচনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিস, মেডিকেল টিম ও তথ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
পূজার ছুটি ও বিচ কার্নিভ্যালকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমনে কুয়াকাটার পর্যটননির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিক্রি বেড়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে পর্যটকের চাপ সামলানো, সেবার মান নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর নজরদারি বজায় রাখাই এখন সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।