পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরা নিষিদ্ধকালে কর্মহীন জেলেদের জন্য বরাদ্দ সরকারি চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম দেওয়া, বিলম্বে বিতরণ, অর্থ আদায় ও প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত করার মতো একাধিক অভিযোগে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, নিবন্ধিত প্রতি জেলেকে মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসের জন্য ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা। তবে জেলেরা বলছেন, চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে জনপ্রতি ৭৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) ও গতকাল শনিবার (২৫ এপ্রিল) ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চাল বিতরণের পর এসব অনিয়ম প্রকাশ্যে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে ঘোষিত তেঁতুলিয়া নদীতে দুই মাস মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকায় উপজেলার প্রায় ৬ হাজার নিবন্ধিত জেলের জন্য ৪৮০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৫৫ জন জেলের জন্য বরাদ্দ ছিল ১১৬ দশমিক ৪০০ টন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চাল উত্তোলন ও বিতরণের অনুমতি দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ের পুরো দুই মাস পর এই বিতরণ কার্যক্রম শুরু করা হয়।
বিতরণ প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে, দুজন জেলের জন্য ৫০ কেজির তিন বস্তা (মোট ১৫০ কেজি) চাল দেওয়া হচ্ছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের পাওয়ার কথা ছিল ১৬০ কেজি। ফলে প্রত্যেক জেলে ৫ কেজি করে কম পাচ্ছেন।
৮ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে নান্নু মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের দুই মাসে ৮০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা থাকলেও ৭৫ কেজি দেওয়া হয়েছে।’
এ ছাড়া ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জসিম হোসেনের বিরুদ্ধে পরিবহন খরচের কথা বলে প্রত্যেক জেলের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে চাল বিতরণের অভিযোগও রয়েছে।
ওই ওয়ার্ডের জেলে হেলাল হাওলাদার বলেন, প্রকৃত জেলেদের নাম ব্যবহার করে অন্য পেশার লোকজন চাল পেয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি সদস্য জসিম হোসেন বলেন, ‘কোনো অনিয়ম হয়নি। যাঁদের চাল কম দেওয়া হয়েছে, তা অন্য জেলেদের মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে।’
অন্যদিকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইউপি সদস্যের অনুপস্থিতিতে এক নারী সদস্যের স্বামী রিপন খান চাল বিতরণ করেন। তাঁর বিরুদ্ধেও প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে অন্য পেশার লোকদের মধ্যে চাল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কার্ডধারী কয়েকজন জেলে অভিযোগ করে জানান, কার্ড থাকা সত্ত্বেও তাঁরা চাল পাননি। তবে রিপন খান দাবি করেন, তালিকা অনুযায়ী চাল বিতরণ করা হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের একাধিক সূত্র জানায়, চেয়ারম্যান অনুপস্থিত থাকায় প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আবুল বশার মৃধার সময় থেকেই বিভিন্ন বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ বাড়ছে। ৮০ কেজির পরিবর্তে ৭৫ কেজি করে চাল দেওয়ার ফলে ইউনিয়নে কয়েক টন চাল কম বিতরণ হয়েছে।
এ বিষয়ে প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল বশার মৃধা বলেন, বরাদ্দের তুলনায় জেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ৫ কেজি করে কম দিয়ে অন্যদের মধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে।
ট্যাগ অফিসারের অনুপস্থিতিতে চাল বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ভালো বলতে পারবেন। পরিবহন সংকটের কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে।’
চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা বাসুদেব সরকার বলেন, ‘সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিতরণ হওয়ায় আমি উপস্থিত থাকতে পারিনি। অন্যদিন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা মানা হয়নি।’
ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহাদী আমিন বলেন, নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা বরাদ্দের চেয়ে বেশি হওয়ায় সমন্বয় করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেটি বিতরণ করতে হবে। কোনোভাবেই কম দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।