১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া গুলি বিদ্ধ হয়েছিল মন্নাস আলীর পেটে। এ কারণে প্রায় সময় অসুস্থ থাকলেও অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারেননি ঠিকমতো। দীর্ঘ ৫৫ বছর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার নজির নিজের শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব মন্নাস আলী। অবশেষে স্থানীয় কয়েক তরুণের উৎসাহ এবং সহযোগিতায় যেন অভিশাপমুক্ত হলেন মন্নাস আলী।
আজ শনিবার দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মন্নাস আলীর (৭৫) পেট থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে গুলিটি অপসারণ করা হয়। আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) তানজিরুল ইসলাম রায়হানের নেতৃত্বে একটি মেডিকেল টিম সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার চালিয়ে বের করেন গুলি। মন্নাস আলী নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নের হরিয়াউন্দ গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দুর্গাপুরে পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করেছিল। সে সময় গাঁওকান্দিয়া ইউনিয়নে বীর মুক্তিযোদ্ধারা তিনজন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করে মাটিচাপা দেন। এই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি বাহিনী আশপাশের গ্রামগুলোতে গণহারে হত্যাযজ্ঞ চালায়।
এর অংশ হিসেবে অর্ধশতাধিক মানুষকে ঘরের ভেতরে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং নির্বিচার গুলি চালানো হয়। এতে অনেকে আগুনে পুড়ে ও গুলিতে নিহত হন। কেউ কেউ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে যান। মন্নাস আলীও সেদিন পালানোর চেষ্টা করছিলেন। তখন পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া একটি গুলি তাঁর পেটে বিদ্ধ হয়।
সেই থেকে এই গুলি যেন তাঁর শরীরের একটা অংশ হয়ে যায়। দারিদ্র্যের কারণে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারেননি। অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করার বিষয়ে মনে ভীতিও কাজ করত। এই অবস্থায় শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে জীবন পার করছিলেন তিনি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর কষ্টের বিষয়টি উঠে এলে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে স্থানীয় যুবক মোশারফসহ কয়েকজনের উদ্যোগে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
মন্নাস আলীর ছেলে আবুল হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা গুলির কারণে বেশির ভাগ সময় অসুস্থ থাকতেন। টাকার অভাবে আমরা চিকিৎসা করাতে পারিনি। তা ছাড়া বাবাও গুলি বের করা নিয়ে খুব ভয় পেতেন। সবার সহযোগিতায় আজ বাবার শরীর থেকে গুলিটি বের করা হয়েছে। আমরা সবার কাছে দোয়া চাই।’
মন্নাস আলীর পুত্রবধূ হামিদা খাতুন বলেন, ‘আমার শ্বশুর সব সময় বলতেন, তার শরীরে গুলি রয়ে গেছে। মৃত্যুর পর যেন গুলি বের না করেই তাকে দাফন করা হয়। আজ আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন। আমরা নিজের চোখে গুলিটি দেখলাম।’
দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানজিরুল ইসলাম রায়হান বলেন, শুক্রবার মোশারফ নামের এক ব্যক্তি মন্নাস আলীকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্স-রে করার পর তাঁর পেটে গুলি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
ডা. তানজিরুল ইসলাম রায়হান আরও বলেন, ‘টাকার অভাবে তিনি এত দিন চিকিৎসা নিতে পারেননি জেনে আমরা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে অস্ত্রোপচারটি করেছি। আজ সফলভাবে গুলিটি অপসারণ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া গুলির বিষয়ে স্থানীয় থানা-পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি সুস্থ আছেন এবং তাঁকে আরও তিন-চার দিন হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে।’