সিলেটবাসী এবং ভ্রমণে আসা পর্যটকদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম রেলপথ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই রেলযাত্রা হয়ে উঠছে বিরক্তির ও ভোগান্তির। টিকিট-সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো, ইঞ্জিনের ত্রুটি ও সংকটের কারণে নিয়মিতই ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যস্ত হচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছেন এ অঞ্চলের যাত্রী ও ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা। পাশাপাশি সিলেট-আখাউড়া রেলপথের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন দীর্ঘদিন নানা সমস্যায় জর্জরিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাত ১০টায় উপবন এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও গত কয়েক দিন ট্রেনটি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় তিন থেকে চার ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ছে। যাত্রীদের ভাষ্য, গত কয়েক দিন প্রায় প্রতিদিনই এমন ঘটনা ঘটছে, যা যাত্রাপথকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের পাহাড়ি এলাকায় ট্রেন চালাতে শক্তিশালী ইঞ্জিন প্রয়োজন। তবে রেলওয়ের কাছে পর্যাপ্ত অতিরিক্ত ইঞ্জিন নেই। যে কটি ইঞ্জিন রয়েছে, সেগুলো নিয়মিত মেরামত করেই চালাতে হয়। ফলে কোনো একটি ইঞ্জিন বিকল হলে দ্রুত বিকল্প ইঞ্জিন দেওয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া একটি ইঞ্জিন একবার চলাচলের পর কয়েক ঘণ্টা ‘ওয়াশ’ ও বিশ্রামে রাখতে হয়। এসব কারণেই উপবন এক্সপ্রেস দেরিতে ঢাকা থেকে ছেড়েছে এবং সিলেট পৌঁছাতেও বিলম্ব হয়েছে।
রেলস্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তনগর ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে চলাচল করে। এই ছয়টি ট্রেনই শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া হয়ে সিলেট স্টেশনে আসে। এ ছাড়া শমশেরনগর ও ভানুগাছ স্টেশন রয়েছে। তবে যাত্রী ও পর্যটকের চাপ সবচেয়ে বেশি শ্রীমঙ্গল ও সিলেট স্টেশনে। অথচ চাহিদার তুলনায় এসব স্টেশনে টিকিটের বরাদ্দ খুবই কম।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, সিলেটবাসীর জন্য ট্রেনযাত্রা এখন নিয়মিত ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রেন বিলম্বে ছাড়ে। লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি এলাকায় উঁচু টিলায় ট্রেন আটকে থাকার ঘটনাও নিয়মিত ঘটে। টিকিটের সংকটের কারণে স্থানীয় যাত্রীরা প্রয়োজনের সময় ট্রেনে যাতায়াত করতে পারছেন না। স্টেশনে গেলেই শোনা যায়, টিকিট নেই। অবকাঠামোর উন্নয়ন না হওয়ায় ঝুঁকি নিয়েই ট্রেন চলাচল করছে। ব্রিটিশ আমলে রেললাইন নির্মাণ করা হলেও এরপর বড় কোনো উন্নয়ন হয়নি।
সিলেটের কয়েকটি স্টেশন ঘুরে জানা গেছে, প্রায় এক শ বছর আগে ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলে রেললাইন স্থাপন করা হয়। সে সময় চা ও অন্যান্য পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিবহনের জন্য রেলপথ ব্যবহৃত হতো। ট্রেনভ্রমণ তুলনামূলক আরামদায়ক হওয়ায় পরে যাত্রীর সংখ্যাও বাড়ে। তবে ব্রিটিশ আমলে ভালোভাবে ট্রেন চললেও স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে রেলপথ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।
যাত্রী জাকির হোসেন ও সাজিদ মিয়া বলেন, ‘রাতের ট্রেন সকালে ছাড়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময় এসএমএস করে জানালে আমরা সময়মতো আসতে পারতাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেনে বসিয়ে রাখা হয়।’ তাঁদের অভিযোগ, সিলেট অঞ্চলের প্রায় সব ট্রেনের ইঞ্জিন দুর্বল। দ্রুত এসব ইঞ্জিন পরিবর্তন করা জরুরি।
জানতে চাইলে কুলাউড়ার রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার রুমান আহমেদ বলেন, ‘গত কয়েক দিন ধরে কয়েকটি ট্রেন বিলম্বে চলছে। এর পেছনে ঘন কুয়াশা ও দুর্বল ইঞ্জিনসহ একাধিক কারণ রয়েছে। এসব কারণে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়তে পারছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট অঞ্চলে টিকিটের চাহিদা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রীর তুলনায় টিকিটের সংখ্যা অত্যন্ত কম।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) মো. সজিব আল হাসান বলেন, একটি ইঞ্জিন এলে আবার অন্য রুটে পাঠাতে হয়। রেলওয়ের কাছে অতিরিক্ত কোনো ইঞ্জিন নেই, ফলে বিকল্প দেওয়ার সুযোগও থাকে না। সিলেট অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় সব ইঞ্জিন চলাচল করতে পারে না। উপবন এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় গত দুদিন ট্রেনটি বিলম্বে চলেছে। গতকাল রাতে পারাবত এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ব্যবহার করে উপবন এক্সপ্রেস সিলেটের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছে।