টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানির উচ্চতা বাড়ায় ঝালকাঠির নিম্নাঞ্চলে জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীর পানি বেড়ে কৃষিজমি, আমনের বীজতলা, গ্রামীণ সড়ক এবং নিচু এলাকার বসতভিটায় পানি ঢুকে পড়েছে। এতে কৃষক, নিম্ন আয়ের মানুষ ও নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিষখালী নদীর কয়েকটি এলাকায় নতুন করে নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর ও কাঠালিয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি জমে ফসলি জমি, আমনের বীজতলা এবং গ্রামীণ সড়কের বিস্তীর্ণ অংশ তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বসতবাড়ির আঙিনায়ও পানি উঠেছে। টানা বর্ষণ ও জোয়ারের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানিও স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
সকালে জেলার বিভিন্ন গ্রামের কাঁচা সড়ক পানিতে তলিয়ে যেতে দেখা যায়। অনেক শিক্ষার্থীকে হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে। পানির নিচে ডুবে থাকা আমনের বীজতলার পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষতির হিসাব কষতে দেখা গেছে কৃষকদের।
শহর এলাকাতেও টানা বৃষ্টির কারণে মানুষের চলাচল কমে গেছে। দীর্ঘ সময় যাত্রীর অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে রিকশাচালকদের।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন আমন চাষিরা। পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক বীজতলা। কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত পানি না নামলে রোপণের জন্য প্রস্তুত করা চারা নষ্ট হয়ে চলতি মৌসুমে আমনের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
নলছিটি উপজেলার শীতলপাড়া এলাকার কৃষক মামুন হোসেন বলেন, `অনেক কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করেছি। এখন সব পানির নিচে। আর কয়েক দিন পানি থাকলে পুরো বীজতলাই নষ্ট হয়ে যাবে।'
টানা বৃষ্টিতে আয়ের পথও সংকুচিত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষের। ঝালকাঠি শহরের রিকশাচালক মো. আক্কাস ফরাজী বলেন, `৫ তারিখ থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যাত্রীও আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না। সারাদিন রিকশা চালিয়েও সংসার চালানোর মতো আয় হচ্ছে না।'
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে শিক্ষা কার্যক্রমেও। অনেক গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতে দুর্ভোগ বেড়েছে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার নথুল্লাবাদ ইউনিয়নের সৈয়দ জামিলা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, `ভারী বর্ষণের ফলে ঘর থেকে বের হওয়াই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমে গেছে।'
এদিকে বিষখালী নদীতীরবর্তী চর ভাটারকান্দা এলাকায় আবারও নদীভাঙনের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা ব্লক স্থাপন করা হলেও নদীর তীব্র স্রোতে অন্য অংশে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। এতে নদীতীরবর্তী পরিবারগুলোর উদ্বেগ বাড়ছে।
ঝালকাঠি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, `নিম্নচাপ ও মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এভাবে টানা বৃষ্টিপাত চলতে থাকলে আমনের কিছু বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে এবং পানি নেমে গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।'
ঝালকাঠী পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এ. কে. এম. নিলয় পাশা আজকের পত্রিকাকে বলেন,`টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রভাবে জেলার নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেলেও এখন পর্যন্ত তা বিপদসীমার নিচে রয়েছে।'
নদীতীরের বাসিন্দারা জানান, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি বাড়লেই ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্থায়ী নদীতীর রক্ষা বাঁধের অভাবে বছরের পর বছর আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। তাই দ্রুত কার্যকর নদীতীর রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।