যশোরের মনিরামপুরে কপোতাক্ষ নদের ওপর কাঠ ও বাঁশ দিয়ে নিজ অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন প্রবাসী যুবক জিয়াউর রহমান। নৌকায় পারাপারের ঝুঁকি ও ভোগান্তি কমাতে উপজেলার ডুমুরখালী বাজার-সংলগ্ন খেয়াঘাট এলাকায় তিনি প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ ফুট দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণ করেছেন। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
এই সেতুর মাধ্যমে মনিরামপুর ও ঝিকরগাছা—দুই উপজেলার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ফলে যাতায়াতের দূরত্ব ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার কমেছে।
নদের এক পারে মনিরামপুর উপজেলার ডুমুরখালী বাজার এবং অপর পারে ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রাম। এ ছাড়া নদীর ওপারে ডুমুরখালী গ্রামের মানুষের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও মাছের ঘের রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে দুই পারের মানুষকে নৌকায় পারাপারের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হতো। বর্ষা মৌসুমে কিংবা রাতে জরুরি প্রয়োজনে এই পারাপার হয়ে উঠত আরও বিপজ্জনক। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নৌকায় চলাচলের সময় একাধিক দুর্ঘটনাও ঘটেছে।
উদ্যোক্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ডুমুরখালী বাজারে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও একটি বাজার আছে। এগুলোর উন্নয়নের কথা ভেবে সেতু করা। নদের ওপারের ঝিকরগাছার মানুষজন এপারে আসতে খুব কষ্ট। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে নদ কানায় কানায় ভরে যায়। নৌকা পার হতে তখন খুব সমস্যা হয়। আমি কয়েকবার নৌকা ডুবে যেতে দেখেছি। নৌকা ডুবে বাচ্চাদের বইখাতা ভিজে যেত। সেতু হওয়াতে উজ্জ্বলপুর, বালিয়াডাঙ্গা, খোশালনগর, ডুমুরখালী, রূপসপুর, তাজপুর ও দশআনিকোলা গ্রামের মানুষের নদ পারাপারে গন্তব্যে পৌঁছানো সহজ হয়েছে।’
জিয়াউর রহমান জানান, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। ১৯ বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। ছুটিতে বাড়ি এসে সেতু নির্মাণের দাবিতে একাধিকবার স্থানীয় সাবেক জনপ্রতিনিধির কাছে গেলেও সাড়া পাননি। পরে নিজ উদ্যোগে অর্থায়ন করে সেতু নির্মাণে হাত দেন তিনি।
জিয়াউর রহমান বলেন, ‘এলাকাবাসীর সম্মতিতে কাজ শুরু হয়। ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬ ফুট প্রস্থের সেতুটি নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৪০০টি বাঁশ, ২৬০টি সেগুন কাঠ ও লোহার পেরেক। ২৮ দিন ধরে শ্রমিকেরা কাজ করেছেন। প্রথম ১২ দিন ১০ জন করে শ্রমিক আর পরের কয়দিন ৪ জন করে শ্রমিক কাজ করছেন। এক পাশের রেলিংয়ের কাজ বাকি আছে। এটা শেষ হলে রং টেনে বৃহস্পতিবার সেতু উদ্বোধন করব।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই সেতুর ফলে উজ্জ্বলপুর, বালিয়াডাঙ্গা, খোশালনগর, ডুমুরখালী, রূপসপুর, তাজপুর ও দশআনিকোলা গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হয়েছে। শিক্ষার্থীরা সময়মতো স্কুলে যেতে পারবে, রোগীরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিতে পারবে।
ঝিকরগাছা উপজেলার উজ্জ্বলপুর গ্রামের রেখা বেগম বলেন, ‘আগে ডিঙি নৌকায় পার হতে মাঝিকে ধান দিতে হতো। এখন সেতু দিয়ে সহজে যাতায়াত করতে পারছি।’
ডুমুরখালী এলাকার কওসার আলী বলেন, ‘মেয়ের বাড়ি যেতে আগে বাঁকড়া ঘুরে চার-পাঁচ মাইল পথ পাড়ি দিতে হতো। এখন সেতু দিয়ে সরাসরি যাওয়া যায়।’
জিয়াউর রহমান বলেন, এই সেতু দিয়ে পারাপারের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হবে না। সাইকেল, মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ভ্যান ও ইজিবাইক চলাচল করতে পারবে। ভবিষ্যতে সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হলে নিজ খরচে মেরামতের আশ্বাসও দেন তিনি।
হরিহরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ডুমুরখালী খেয়াঘাট দিয়ে নদের ওপারের বহু মানুষ যাতায়াত করে। কাঠ ও বাঁশের সেতু নির্মাণ করে জিয়া মহৎ কাজ করেছেন। এখানে একটি স্থায়ী কংক্রিটের সেতু প্রয়োজন। বিষয়টি উপজেলা পরিষদের সভায় তোলা হবে।