যশোরের মনিরামপুর ও মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৫৩টি ঘর নির্মাণ করা হলেও সেগুলো তালাবদ্ধ পড়ে আছে। এর মধ্য মনিরামপুরের ৩৬ ঘর নির্মাণের দেড় বছরেও তা ভূমি ও গৃহহীনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। আর সাটুরিয়ার ১৭টি ঘর উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেওয়া হলেও তাঁরা সেখানে ওঠেননি। ফলে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা এসব ঘর মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। তাদের উৎপাত ও কোনো কোনো ঘরের দরজা-জানালাও ভেঙে যাওয়ায় সেগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
মনিরামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন (পিআইও) দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পঞ্চম ধাপের শেষ পর্যায়ে উপজেলায় ১ কোটি ৮৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা বরাদ্দে মোট ৬২টি আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে পৌরসভা এলাকার মহাদেবপুর গ্রামে ৩৬টি, রোহিতা ও গোবিন্দপুরে ৯টি করে ১৮টি এবং শেখপাড়া খানপুর ও চালুয়াহাটির হরিসপুরে চারটি করে আটটি ঘর রয়েছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকা।
পিআইও কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ-সংযোগ ও নলকূপ স্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়। একই দিনে ঘরগুলোর চাবি উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও অধিকাংশ ঘরে বিদ্যুৎ-সংযোগ কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা হয়নি।
মনিরামপুর-ঢাকুরিয়া সড়কের জয়পুর কাছারি বাড়ি মোড় থেকে পূর্ব দিকে ইটের একটি সলিং রাস্তা নেমে এসেছে। সেই রাস্তা ধরে জয়পুর মান্দারতলা ঈদগাহ হয়ে কাঁচা রাস্তা বয়ে কিছু দূর এগিয়ে দক্ষিণ দিকে তাকালে চোখে পড়ে মহাদেবপুর মৌজায় নির্মিত রঙিন টিনের রং করা সারি সারি ৩৬টি আধা পাকা ঘর। যার উত্তর ও পূর্ব পাশে রয়েছে ফসলের মাঠ।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, মহাদেবপুরের আশ্রয়ণ প্রকল্পে নির্মিত পাঁচ সারির ৩৬টি ঘরই খালি পড়ে আছে। এর মধ্যে অন্তত ৯টি ঘরের তালা ভাঙা। অনেক ঘরের বারান্দায় শুকানো হচ্ছে গোবর, কোথাও বাঁধা রয়েছে গবাদিপশু। কয়েকটি ঘরে রাখা হয়েছে খড়কুটা ও অন্যান্য জ্বালানিসামগ্রী। একটি ঘরে আগুন দেওয়ার চিহ্নও দেখা গেছে।
স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেড় বছর আগে ঘরগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখনো কেউ বসবাস শুরু করেনি। দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে মাদকসেবীদের আনাগোনা থাকে।
জয়পুর গ্রামের নাজমা বেগম বলেন, ‘আমার মা বেছুরেন্নেছা মহাদেবপুর মৌজায় দেড় বিঘা জমি পেয়েছিলেন। সেই জমি পরে খাস হয়ে গেলে তাতে ৩২টি ঘর করেছে সরকার। আমরা পাঁচ ভাইবোন। জমিজমা না থাকায় মামার ভিটায় থাকি। জমি নেওয়ার সময় ইউএনও বলেছিল, আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে পাঁচটি ঘর দেবে। ঘরের কাজ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। কাগজপত্র না দেওয়ায় আমরা ঘরে উঠতে পারিনি। সব ঘর খালি পড়ে আছে।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন বলেন, আশ্রয়ণের যেসব ঘর হস্তান্তর করা হয়নি, সেগুলোর হস্তান্তরকাজ ধাপে ধাপে চলমান আছে। চলতি সপ্তাহে ১১টি ঘর হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বরাইদ ইউনিয়নের খলিশাডহুরা এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৭টি ঘর বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে আছে। বসবাস তো দূরের কথা, অযত্নে ঘরগুলোর চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছে। বারান্দায় জমেছে আবর্জনা। অন্যদিকে একই এলাকার প্রকৃত ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলো এখনো একটি সরকারি ঘরের আশায় দিন গুনছে।
সাটুরিয়া পিআইও কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় খলিশাডহুরা এলাকায় ১৭টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ, একটি রান্নাঘর ও একটি টয়লেট রয়েছে। প্রতিটি ঘর নির্মাণে সরকারি ব্যয় হয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। নির্মাণ শেষে ঘরগুলো উপকারভোগীদের বুঝিয়ে দেওয়া হলেও বর্তমানে কোনো উপকারভোগী সেখানে বসবাস করছেন না।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্পের ১৭টি ঘরের প্রতিটিই তালাবদ্ধ। কয়েকটি ঘরের দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া দূরের এলাকার ব্যক্তিদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যাঁদের নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে, তাঁদের অধিকাংশই উপজেলার প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরের বালিয়াটি, হাজিপুর ও খলিলাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। কর্মস্থল ও বসতভিটা ওই এলাকায় হওয়ায় তাঁরা খলিশাডহুরায় এসে বসবাস করছেন না।
খলিশাডহুরা গ্রামের বাসিন্দা শাহানাজ বেগম বলেন, মানুষ না থাকায় ঘরগুলোর বারান্দায় এলাকার লোকজন ট্রাক্টর, মাটি, গোবর ও ভুট্টাগাছ রেখে দিচ্ছে। অযত্নে ঘরগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. রমজান আলী বলেন, ‘এলাকায় অনেক প্রকৃত ভূমিহীন পরিবার রয়েছে। তাদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়ার জন্য একাধিকবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
সাটুরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খলিলুর রহমান মোল্লা বলেন, ‘প্রকল্পটি পরিদর্শন করে দেখেছি, ১৭টি ঘরের সবগুলোই তালাবদ্ধ। সেখানে কোনো উপকারভোগী বসবাস করছেন না।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যাঁরা বরাদ্দ পেয়েও ঘরে বসবাস করছেন না, তাঁদের নোটিশ দিয়ে কারণ জানতে চাওয়া হবে। যেহেতু তাঁদের নামে দলিল সম্পন্ন হয়েছে, তাই আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’