যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত মেধাবী ছাত্র জামিল আহমেদ লিমনের শৈশবের সাথিরাও কদিন ধরেই বিমর্ষ, শোকগ্রস্ত। যাঁর সঙ্গে বছরের পর বছর একই স্কুলে পড়াশোনা, খেলাধুলা—সেই বন্ধুটির বিদেশ বিভুঁইয়ে নিঃসঙ্গ অবস্থায় এমন নির্মম পরিণতির কথা ভেবে বারবার চোখের জল লুকাচ্ছেন তাঁরা। লিমনের শিক্ষকেরা পর্যন্ত মেনে নিতে পারছেন না এমন বিনয়ী, ভদ্র ছেলেটির এই করুণ মৃত্যু।
বাবার চাকরির সুবাদে লিমনের স্কুলজীবন কেটেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে। উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের রঙিলা বাজার এলাকার প্যারাডাইজ স্পিনিং কারখানায় চাকরি করতেন বাবা জহুরুল হক। আর লিমন পড়াশোনা করতেন মাওনা জেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরবর্তীকালে বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মেধার স্বাক্ষর রেখে ২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
লিমনের স্কুলশিক্ষক মো. মোখলেছুর রহমান আক্ষেপ করে বলছিলেন প্রিয় ছাত্রের সম্পর্কে। জানালেন, নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর এক বন্ধুর কাছ থেকে তিনি খবর পান। কম কথা বলা ছেলেটি পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো ছিল। ক্লাসে তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি ছিল। প্রতিটি পরীক্ষায় মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি।
আরেক শিক্ষক মো. আমিনুল কাদের বলেন, ‘লিমন খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। আমি তাকে রসায়ন পড়াতাম। হঠাৎ করে এমন খবরটি শুনে খুবই খারাপ লাগল। খুবই কষ্ট পেয়েছি। লিমন এমন মেধাবী ছিল, যেকোনো বিষয়ে একবার বোঝালে সে অন্য সহপাঠীদের তা বোঝাতে সক্ষম হতো। আজ সেই প্রিয় ছাত্রটি নেই, এটা মানতে পারছি না।’
জামিল আহমেদ লিমন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি জামালপুরের মাদারগঞ্জে।
মাওনা জেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল হালিম স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘লিমনের মৃত্যুর খবর শুনে মানতে পারছি না। অনেক কঠিন কষ্টের একটা খবর পেয়েছি। মনটা খারাপ হয়ে গেল। ক্লাসে সে ফার্স্ট বয় ছিল। আমার দৃষ্টিতে তার মতো বিনয়ী ছাত্র খুব কম। মেধাবী একটা ছেলে উচ্চতর পড়াশোনা করার জন্য বিদেশ গেল। তার এমন পরিণতি খুব কষ্টকর। দেশের অনেক বড় সম্পদ ছিল লিমন, যাকে আমরা এভাবে হারিয়ে ফেললাম!’
লিমন সবশেষ ২০২২ সালে নিজের সহপাঠীদের সঙ্গে শ্রীপুরের সি-গাল রিসোর্টে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। এমন সংবাদে তাঁর সাত বছরের সহপাঠী তৌহিদুর রহমান অনিক বলেন, ‘তৃতীয় শ্রেণি থেকে এসএসসি পর্যন্ত সহপাঠী ছিলাম। লিমন অসাধারণ মেধাবী একজন ছাত্র ছিল। গত ২০২২ সালে আমাদের ব্যাচের পুনর্মিলনীতে অনেক দিন পর তার সঙ্গে দেখা হয়। বন্ধুকে কাছে পেয়ে অনেক আলাপ হয়েছে। হয়েছে পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থন। এরপরও মাঝেমধ্যে ফোনে যোগাযোগ হতো। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার খবরটি পাই এক বন্ধুর মাধ্যমে। তখন থেকেই আমার মন খারাপ। এরপর যখন মৃত্যুর সংবাদ শুনলাম, রাতে ঘুম আসেনি। প্রিয় বন্ধুর এমন সংবাদ কে আশা করে! আমরা যারা তার সঙ্গে পড়াশোনা করেছি, তারা এই খবরে ব্যথিত হয়েছি। খুব শান্ত স্বভাবের ছেলে ছিল সে। তার এমন পরিণতি মেনে নেওয়া কঠিন।’
নিহত জামিল আহমেদ লিমনের বাবা জহুরুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে বলেন, ‘আমি শ্রীপুরে চাকরি করতাম। সেখানে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি। আমার তো এখন সব শেষ হয়ে গেল। আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আমরা এখন ছেলের মরদেহের অপেক্ষায় আছি। আমাদের সবার জন্য দোয়া করবেন, সহযোগিতা করবেন। এমন সময়ের জন্য কোনো বাবার যেন অপেক্ষা করতে না হয়।’