গাজীপুরের শিল্প এলাকা
শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরে গ্যাসের চাপ শূন্যের কোঠায় নামায় একের পর এক শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হচ্ছে। গ্যাসের তীব্র সংকট শিল্পোদ্যোক্তা ও শ্রমিক-কর্মচারী সবার জন্যই উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
সরেজমিন খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সপ্তাহখানেক আগেও রাতদিন শ্রমিকদের পদচারণে মুখর থাকত গাজীপুরের সফিপুর এলাকার গোমতী টেক্সটাইল কারখানা। গ্যাস-সংকটের কারণে হঠাৎ এ কারখানায় নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা। মালিকপক্ষ বাধ্য হয়ে টেক্সটাইল, ডাইং ও নিটিং সেকশন বন্ধ করে দিয়েছে। এ কারখানার প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিকের প্রায় সবাই কাজ ছাড়া সময় কাটাচ্ছেন। প্রতিদিন ডিজিটাল হাজিরা দিয়ে তাঁরা যে যাঁর মতো বেরিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা।
গোমতী টেক্সটাইলের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘লাইনে কোনো গ্যাসই নেই। একেবারে শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে। প্রথম দিকে দু-এক দিন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় জ্বালানি কিনে কারখানা চালু রাখলেও শেষ পর্যন্ত সেটা আর সম্ভব হয়নি। ফলে ১৯ জুলাই আমরা কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। শ্রমিকেরা প্রতিদিনের মতো এসে হাজিরা দিয়েই কর্মস্থল ত্যাগ করছেন।’
একই দৃশ্য পার্শ্ববর্তী মৌচাক এলাকার সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডের কারখানায়। সেখানকার প্রায় ৭ হাজার শ্রমিক কার্যত কর্মহীন। উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে। লাইনে কোনো গ্যাস নেই। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও কারখানা ঠিকমতো চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
সাদমা ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল রানা বলেন, ‘কারখানা চালু রাখার জন্য গ্যাসের চাপ কমপক্ষে ৪ পিএসআই থাকা প্রয়োজন। সেখানে সোমবার সকাল থেকে ১ পিএসআইও ছিল না। উৎপাদন বন্ধ রাখা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।’
আমবাগ এলাকার দুই হাজার শ্রমিকের তাপস পিএন কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারখানার মালিক তাপস কুমার তালুকদার বলেন, ‘গ্যাস-সংকটে উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে।’
মহানগরের কোনাবাড়ী এলাকার তুসুকা গ্রুপের কারখানা জেনারেটরের সহায়তায় চালু রাখা হয়েছে। এ কারখানার পরিচালক তারেক হাসান বলেন, ‘শুধু ডিজেল কেনায় প্রতিদিন বাড়তি খরচ হচ্ছে ২০ লাখ টাকা। আমাদের ৫টি জেনারেটর চালু রাখতে হচ্ছে।’
গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা, বোর্ড বাজার, টঙ্গী, শ্রীপুর, কালিয়াকৈরসহ সব এলাকাতেই গ্যাসের সংকট চলছে। ছোট ও মাঝারি অন্তত অর্ধশত কারখানার উৎপাদন একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক কারখানাতে উৎপাদন ৫০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
উদ্যোক্তারা জানান, স্বাভাবিকভাবে গ্যাসের চাপ ১০-১৫ পিএসআই দরকার হলেও অনেক কারখানাতেই বর্তমানে মিলছে মাত্র ১-৩ পিএসআই। কোনো কোনো কারখানায় একেবারে শূন্য পিএসআই।
গাজীপুরে জেলা ও মহানগরে তিন হাজারের বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা। বেশির ভাগেরই এই অবস্থা। একটা অংশ জেনারেটর দিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। উদ্যোক্তারা অনুমানের ভিত্তিতে বলছেন, উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। তবে উৎপাদন প্রকৃতই কতটা কমেছে বা কতগুলো কারখানার উৎপাদন একেবারে বন্ধ, সে তথ্য নেই শিল্প পুলিশ বা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের কাছে।
গাজীপুরের কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক প্রকৌশলী এম এম মামুন-অর-রশিদ জানান, গ্যাস-সংকট চলছে। তবে ঠিক কতগুলো কারখানায় এর প্রভাব পড়েছে, সে তথ্য তাঁর কাছে নেই।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ-২—এর পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, ‘এটা তো চলমান একটা সংকট। সে কারণে আসলে সঠিক তথ্যটা জানানো কঠিন। তবে পুরো বিষয়টিই আমরা সর্বক্ষণ মনিটরিংয়ে রেখেছি।’
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে শুধু যে মালিকপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এমন নয়। শ্রমিকেরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
তিতাস গ্যাস গাজীপুর জোনের ব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. গোলাম ফারুক আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জেলা ও মহানগরে দৈনিক প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে ৩০ কোটি ঘনফুট।’