হোম > সারা দেশ > গাইবান্ধা

গাইবান্ধায় জলাতঙ্ক টিকার সংকট, ৩ রোগীর মৃত্যুর দায় নিচ্ছেন না কেউ

আনোয়ার হোসেন শামীম, গাইবান্ধা

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

গাইবান্ধায় জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার একমাত্র জেনারেল হাসপাতাল থেকে এই রোগের ভ্যাকসিন/টিকা সরবরাহ করা হলেও তা নিয়মিত নয়। যাঁরা দায়িত্বে থাকেন, তাঁরা টাকা ছাড়া দিতে চান না বলে অভিযোগ উঠেছে। দূরদূরান্ত থেকে রোগীদের হাসপাতালে এসে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এরই মধ্যে মাত্র ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে জেলায় তিনজন জলাতঙ্ক রোগে মারা গেছেন। এই অবস্থায় র‍্যাবিস নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বেড়েছে।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে টিকিট সংগ্রহ করে তিন ব্যক্তি জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতে দাঁড়িয়ে আছেন। হাসপাতালে ডগবাইট রুমে তালা ঝুলছে। প্রায় আধা ঘণ্টা পরে একজন এসে রুমের তালা খুললেন। রোগীদের সাফ জানিয়ে দিলেন হাসপাতালে কোনো ভ্যাকসিন নেই। বাইরে থেকে কিনে আনতে হবে। পরে রোগীরা বাইরের দোকান থেকে ভ্যাকসিন কিনে নিয়ে আসেন।

জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার সাবদিন গ্রাম থেকে টিকা নিতে এসেছিলেন মো. বিশাল তালুকদার (২৬)। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিড়াল আঁচড় দিয়েছিল। আজ অনেক কষ্ট করে হাসপাতালে টিকা নেওয়ার জন্য আসছি। এসে শুনি ভ্যাকসিন শেষ।’

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা থেকে টিকা নিতে আসা তাসপিয়া (১৮) বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে কোনো ওষুধই পাওয়া যায় না। যে হাসপাতালে সামান্য কুকুর-বিড়াল কামড়ালে চিকিৎসা মেলে না, সেখানে আরও জটিল কঠিন রোগের চিকিৎসা মানুষ ক্যামনে পাবে।’

জলাতঙ্কের টিকা নিতে আসা ববিতা খাতুন বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাওয়ার খরচ ১৬০ টাকা। কত কাজ ফেলে আসছি। এখানে এসে শুনি ভ্যাকসিন নাই। তাহলে ঘোষণা দিয়ে বলে দিলেই হয়, হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত চার মাসে ১ হাজার ৫১৭ জনকে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন পুশ করা হয়েছে। ৮০০ জনকে সরকারি ভ্যাকসিন এবং অন্যরা বাইরে থেকে ভ্যাকসিন কিনে এনে এখানকার স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে তা শরীরে পুশ করেছেন।

রোগীর স্বজনদের দাবি, হাসপাতালটির ঊর্ধ্বতন কর্তারা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বাবধায়ক কোটি টাকার বিনিময়ে তাঁর ইচ্ছেমতো ঠিকাদারকে ওষুধ কেনার দায়িত্ব দেন। আর ঠিকাদার ঠিকমতো ওষুধ সরবরাহ না করে সরকারি টাকা হাতিয়ে নেন। এভাবে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত ২২ এপ্রিল রাজমিস্ত্রি শ্রী রতনেশ্বর কুমার কাজে যাওয়ার পথে বেওয়ারিশ পাগলা কুকুরের কামড়ে গুরুতর আহত হন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে গভীর ক্ষত তৈরি হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের এই ব্যক্তির। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাঁকে নিয়ে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ছিল না কোনো জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন। তাঁকে পাঠানো হয় জেলা জেনারেল হাসপাতালে। সেখানেও একই উত্তর, ‘ভ্যাকসিন নেই।’ শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। ফার্মেসি থেকে বেসরকারি ক্লিনিক—কোথায় যাননি তাঁরা! ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পার হওয়ার পর চড়া দামে একটি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেন তাঁরা। কিন্তু ততক্ষণে রোগীর অবস্থা কাহিল। জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর ৮ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান চিকিৎসাধীন রতনেশ্বর কুমার। এর আগে ৬ মে একই পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা হলেন, কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫) ও কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে ফুলু মিয়া। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।

এই ঘটনায় আরও ১৩ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকায়।

পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা না হলে হতে পারে আরও প্রাণহানি। আক্রান্ত ব্যক্তিদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই কেটে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করলেও ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে র‌্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।

মন্ডলের হাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘মানুষ হাসপাতালে ছুটে যায়, কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। এখন তিনজন মারা গেছে। আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’

কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, বছরখানেক আগে জলাতঙ্কে তাঁর এলাকায় দুজন মারা গেছেন। ভ্যাকসিন না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়নি তাঁদের। সরকারি হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকত, তাহলে এসব মৃত্যু এড়ানো যেত।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক বলেন, ‘আমাদের এখানে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কেউ চিকিৎসা নেয়নি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিনের সরবরাহ ছিল না। এই মাসে ৩০টি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। এসব ভ্যাকসিন জেলা হাসপাতালগুলোয় সরবরাহ করা হয়।’

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের ডগবাইট ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আজকেই হাসপাতালের ভ্যাকসিন শেষ হয়েছে। আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।’ সিন্ডিকেট ও টাকার বিনিময়ে ভ্যাকসিনের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘মানুষের মুখ বন্ধ করা যাবে না। তাই কে কী বলল, এগুলো আর শুনি না।’

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. শহীদুল্লাহর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সব বিষয়ে এত খোঁজ নেওয়ার সুযোগ নাই। পরে খোঁজ নেব।’

গাইবান্ধায় দলিল লেখকদের অনির্দিষ্টকালের কলমবিরতি, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ

জমি রেজিস্ট্রিতে অতিরিক্ত টাকা, প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ

রংপুর চিনিকল: নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ

দুদক পরিচয়ে প্রতারণার সময় হাতেনাতে একজন আটক

কিস্তির টাকা না পেয়ে নারী গ্রাহকের মাথা ফাটালেন কর্মী

তিস্তামুখঘাট থেকে বাহাদুরাবাদঘাট পর্যন্ত সেতু নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন

দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্প: ঠিকাদার লাপাত্তা, এক বছর ধরে কাজ বন্ধ

অবহেলায় আটকে আছে ৯ কোটি টাকার প্রকল্প, দুর্যোগের আশ্রয়কেন্দ্র এখন দুর্ভোগে

কোটি টাকা নিয়ে উধাও ‘তিশা’, দিশেহারা গ্রাহক

কোটি টাকা নিয়ে উধাও এনজিও, দিশেহারা শতাধিক গ্রাহক