ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সব সময় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, দেশের যেকোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেশের অগ্রযাত্রায় এই বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে আজ বুধবার ইতিহাস বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কলা অনুষদের ডিন ড. আবুল কালাম সরকার, ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন, বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনসহ বিভাগের শিক্ষক, বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা, অধিকার আদায় এবং জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের যখনই কোনো দুর্যোগ বা সংকট এসেছে, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।’
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ইতিহাস বিভাগ কেবল অতীতের ঘটনাবলি জানার স্থান নয়; বরং ইতিহাস একটি জাতিকে নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যতের পথচলা সম্পর্কে সচেতন করে। ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের যুক্তিবাদী, বিশ্লেষণধর্মী ও সত্যনিষ্ঠ হয়ে গড়ে উঠতে হবে, যাতে তারা দেশ ও সমাজের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে কায়সার কামাল বলেন, ১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁর মধ্যেও স্বপ্ন ও শঙ্কা ছিল। কিন্তু এই বিভাগ তাঁকে শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষা দেয়নি, বরং মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার শিক্ষা দিয়েছে। ইতিহাস বিভাগের সেই শিক্ষা তাঁকে পরে আইনজীবী, ব্যারিস্টার এবং জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
বক্তব্যের একপর্যায়ে কায়সার কামাল নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ এবং শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরে নিজের শিক্ষাজীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি জানান, পর্যাপ্ত ক্লাসে উপস্থিত না থাকায় অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অনুমতি পাননি। পরে বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন তাঁকে আরও এক বছর নিয়মিত ক্লাস করার পর পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে জীবনে শৃঙ্খলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘ডিসিপ্লিন ছাড়া জীবনে কখনোই বড় হওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুধু একটি সনদ অর্জনের জন্য নয়; এটি নিজেকে যোগ্য, দায়িত্বশীল ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সময়।’ নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ইতিহাস বিভাগকে নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য বা বিদ্রূপ করা হলেও সেসব কথায় গুরুত্ব না দিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই দেশ-বিদেশে সফলতার সঙ্গে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আশফাক হোসেন নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, নবীনদের পদচারণে বিভাগে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন কেবল পাঠ্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জ্ঞান, মূল্যবোধ, মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। নবীন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে অংশগ্রহণ, গবেষণামুখী মানসিকতা গড়ে তোলা এবং ইতিহাসচর্চার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।