কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ভুল চিকিৎসায় ঝুমা বেগম (২০) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া গেছে। শহরের ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। মৃত্যুর পর আজ শনিবার (৩ জানুয়ারি) দুপুরে গৃহবধূর লাশ নেওয়া হয় ভৈরব থানায়। থানায় লাশ রেখেই বিকেলে ৪ লাখ টাকায় রফাদফা হয়েছে বলে জানান রোগীর স্বজন রাশেদ মিয়া।
রোগীর স্বজনেরা জানান, গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ঝুমা বেগমের সিজারিয়ান অপারেশন করেন ডা. হরিপদ দেবনাথ। ওই রোগীকে অ্যানেসথেসিয়া দেন ডা. রাজীব। গৃহবধূ একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেন। রাত ১০টার দিকে ওই মায়ের অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়। পরদিন শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে চিকৎসকেরা জানিয়েছেন রোগীর ভুল চিকিৎসা হয়েছে, তাঁকে বাঁচানো অনেকটা কঠিন। আজ শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই গৃহবধূ মারা যান।
নিহত ঝুমা বেগম পৌর শহরের কালীপুর দক্ষিণপাড়ার কুদ্দুস মিয়ার মেয়ে ও উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়ার তৌফিক মিয়ার স্ত্রী।
এ বিষয়ে রোগীর চাচা রাশেদ মিয়া বলেন, ‘আমার ভাতিজিকে ট্রমা হাসপাতালে ভর্তি করার পর আমরা বলি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অপারেশন করার জন্য। কিন্তু চিকিৎসক হরিপদ বলেন, পরীক্ষা লাগবে না। বৃহস্পতিবার রাতে অপারেশন করার কয়েক ঘণ্টা পর ঝুমার অবস্থা খারাপ হয়। চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁরা জানান রক্ত লাগবে। রাতে ৮ ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও ঝুমার কোনো উন্নতি হয়নি। পরদিন শুক্রবার সকালে চিকিৎসক জানান, রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যেতে। আমরা অস্বীকৃতি জানালে আমাদেরকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দেন। তাঁদের চাপে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করার পর সেখানকার ডাক্তার বলেন, রোগীর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে অনেক ক্ষতি হয়েছে। বাঁচার সম্ভাবনা কম। তারপরও আমরা সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আজ (শনিবার) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঝুমা মারা গেছে।’
গৃহবধূর চাচা রাশেদ মিয়া আরও বলেন, ‘আমি ভৈরবের চিকিৎসককে মৃত্যুর কথা জানালে তিনি বিষয়টি আপস করতে বলেন। আমি এর সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর দুই পক্ষই আপস-মীমাংসায় রাজি হয়। সন্ধ্যার দিকে রাশেদ মিয়া স্বীকার করেন থানার একটু দূরে ৪ লাখ টাকায় আপস করা হয়েছে। ভৈরব থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তালেবের কাছে লিখিত দিয়ে তাঁরা লাশ নিয়ে যান। রাতেই লাশ দাফন করা হবে বলে জানান রাশেদ।
নিহতের শাশুড়ি রিনা বেগম বলেন, ‘আমার পুত্রবধূকে ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ভৈরবের ডাক্তার সিজার করতে গিয়ে ঝুমার জরায়ু কেটে ফেলেছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছে। এজন্য ঝুমার মৃত্যু হয়েছে। আমরা শিশুটিকে কীভাবে মানুষ করব। আমি ঝুমা হত্যাকারীদের বিচার চাই।’
এ বিষয়ে ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ঝুমাকে নিয়মিত চিকিৎসা দিয়েছিলেন ডা. হরিপদ দেবনাথ। অপারেশনের পর মা-বাচ্চা অনেক ভালো ছিল। অপারেশনের পর রাতে হঠাৎ ঝুমার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে আমাদের ডাক্তাররা রক্ত দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন। শুক্রবার সকালে আবারও রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসক রোগীকে ঢাকায় নিয়ে যেতে বলেন। রোগীর স্বজনেরা তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যান। আজ দুপুরে শুনতে পাই ঝুমার মৃত্যু হয়েছে।’
ডা. রাজীব জানান, তিনি অ্যানেসথেসিয়া দেন। আর ডা. হরিপদ দেবনাথ সিজার করেন। রোগী ফ্রেশ ছিল। ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি না, সেটা বলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে কথা বলতে ডা. হরিপদ দেবনাথকে কয়েকবার ফোন করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
ভৈরব থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তালেব বলেন, ‘লাশ থানার বাইরেই ছিল। বিষয়টি ওসি স্যারকে জানালে তিনি এসে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে স্বজনদের লিখিত রেখে লাশ দিয়ে দিতে বলেছেন।’
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘রোগীর মৃত্যুর ঘটনা শুনেছি। তবে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানালে হাসপাতালে পুলিশ পাঠানো হয়।’