কক্সবাজারের টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে নিহত ১০ পর্যটকের মধ্যে ৬ জন একই পরিবারের খালাতো ভাই-বোন। তাঁদের মধ্যে চারজন মেয়ে ও দুজন ছেলে। নিহতদের শরীর এতটাই পুড়ে গেছে যে, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সন্তানদের শনাক্ত করতে পারেনি পরিবার। অবশেষে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কার্যালয়ে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে যান নিহতদের স্বজনেরা।
স্বজনদের মধ্যে রয়েছেন—নিহত মোহাম্মদ নাফিস ও ফারিহা কবিরের বাবা এমপি জেহাদুল কবির। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন দুই মেয়ে ইশরাত জাহান মালিহা ও লায়লা জাহান নাবিলার বাবা মো. মামুনুর রশিদ।
সাত বছর বয়সী ছেলে ফাইজান নূরের মরদেহ শনাক্ত করতে এসেছেন বাবা মো. নূরে আলম। আর মিথিলা মেহেজাবীন আলভীর পরিচয় শনাক্তের জন্য নমুনা দিতে এসেছেন তাঁর বাবা শাহজাহান।
জেহাদুল কবির, মামুনুর রশিদ ও শাহজাহান সম্পর্কে ভায়রা ভাই। নূরে আলম জেহাদুল কবিরের জামাতা।
রক্তের নমুনা দিয়ে সিআইডি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় জেহাদুল কবির বলেন, তাঁদের পরিবারের ছয়জনের মরদেহ এখনো শনাক্ত করা যায়নি। আগুনে পুড়ে সবার শরীর অঙ্গার হয়ে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওদের লাশ কবে নাগাদ শনাক্ত হবে, তা এখনো বলতে পারছি না। এখান থেকে আশ্বাস দিয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে লাশ শনাক্ত করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তবে কত দিন লাগবে, তা বলতে পারছে না।’
সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে জেহাদুল কবির বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের তো আর আমরা ফিরে পাব না। কিন্তু তাদের মরদেহগুলো যেন যত দ্রুত সম্ভব সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, কক্সবাজারের ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছেন। সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে।
নিহত ইশরাত জাহান মালিহা ও লায়লা জাহান নাবিলার চাচা আবু তালেব বলেন, রোববার সকালেই নিহতদের বাবা-মায়েরা নমুনা দিতে মালিবাগের সিআইডি কার্যালয়ে যান। নিহত ব্যক্তিদের দেহাবশেষ থেকে নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা করছে সিআইডি। এ জন্য পরিবারের কয়েকজন প্রতিনিধি কক্সবাজারেও রয়েছেন।
উখিয়ার মেরিন ড্রাইভের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুন লাগে। এতে ১০ জনের মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের ৬ জন রয়েছেন।
তারা হলো ঢাকার খিলগাঁওয়ের পশ্চিম নন্দীপাড়ার এলাকার আশিকুর রহমানের স্ত্রী ইশরাত জাহান মালিহা, তাঁর শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা, মিলিতা মেহজাবিন আলভি ও ফারিহা কবির রয়েছেন। এ ছাড়া রয়েছে পরিবারের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামী জেরিফ এবং নিহত ফারিহা কবিরের সাত বছর বয়সী শিশু ফায়িজা নূর।
স্বজনেরা জানান, পরিবারের সদস্যরা গত বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন। শনিবার তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। সে অনুযায়ী ফেরার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু তার আগেই সকালে আগুনে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডের পর প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে আগুনে নিহত ১০ জনের মরদেহ ভয়াবহভাবে পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের চেহারা দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
সন্তানদের হারানোর শোকের সঙ্গে এখন মরদেহ শনাক্তের অনিশ্চয়তাও বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বজনেরা। প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখতে অপেক্ষা করছেন তাঁরা। তাঁদের আকুতি, দ্রুত ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।