ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টিকে ডেঙ্গুর জন্য অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া ২৮টি ওয়ার্ড মাঝারি ও ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। সংস্থাটির বর্ষাকালীন এডিস লার্ভা জরিপের ফলাফলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আজ বুধবার রাজধানীর নগর ভবন মিলনায়তনে বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা-সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে ডিএসসিসি।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ দিনব্যাপী এ জরিপ পরিচালিত হয়। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি নমুনা হিসেবে নেওয়া হয়। দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচালিত জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নেন।
সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান। তিনি জানান, ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডে মশার ঘনত্ব নির্ধারিত সূচকের চেয়ে বেশি। পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে এডিস মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে।
বাড়ির ধরন অনুযায়ী—একক বাড়িতে ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বহুতল ভবনে ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ, আধা পাকা বাড়িতে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নির্মাণাধীন বাড়িতে ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ ও খালি প্লটে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে। প্রজননস্থলের মধ্যে প্লাস্টিকের বালতিতে ১৪ দশমিক ২১ শতাংশ, প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ ও ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ লার্ভা শনাক্ত হয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, অঞ্চলভিত্তিক অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অঞ্চল-১-এর ধানমন্ডি, কলাবাগান, কাকরাইল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা; অঞ্চল-২-এর খিলগাঁও, গোড়ান, ফকিরাপুল, শাহজাহানপুর, মালিবাগ ও রাজারবাগ; অঞ্চল-৩-এর হাজারীবাগ, গণকটুলী, জগন্নাথ সাহা রোড, লালবাগ, আজিমপুর, বকশীবাজার, ঝাউচর ও পশ্চিম রসুলপুর। এ ছাড়া অঞ্চল-৪-এর মৌলভীবাজার, পশ্চিম জুরাইন ও আলমবাগ; অঞ্চল-৭-এর গ্রিন মডেল টাউন; অঞ্চল-৯-এর উত্তর কুতুবখালী ও আদর্শবাগ এবং অঞ্চল-১০-এর কদমতলী, ওয়াসা কলোনি, দক্ষিণ রায়েরবাগ ও দনিয়া এলাকাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে—অঞ্চল-১-এর ১৮ নম্বর ওয়ার্ড; অঞ্চল-২-এর ৪, ৫, ৬, ৮ ও ১০ নম্বর; অঞ্চল-৩-এর ২৩, ২৯ ও ৫৭ নম্বর; অঞ্চল-৪-এর ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮ ও ৪৩ নম্বর; অঞ্চল-৫-এর ৩৯, ৪০, ৪৬, ৫১ ও ৫২ নম্বর; অঞ্চল-৬-এর ৭৫ নম্বর; অঞ্চল-৭-এর ৭৩ নম্বর; অঞ্চল-৮-এর ৬৭, ৬৮ ও ৬৯ নম্বর এবং অঞ্চল-৯-এর ৬৪ নম্বর ওয়ার্ড।
অন্যদিকে ৩, ৭, ১৭, ২৮ ৩৪, ৪২, ৪১, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৭০, ৭৪, ৭২, ৬৬ ও ৬৩ নম্বর ওয়ার্ড সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডের মধ্যে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ‘আমরা প্রথমেই নির্দেশনা দিয়েছিলাম, জরিপের প্রকৃত ফলাফল যেন কোনো ধরনের দ্বিধা বা সংশয় ছাড়াই প্রকাশ করা হয়। কারণ, এখানে মানুষের জীবনের প্রশ্ন জড়িত। কোন ওয়ার্ড অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, কোনটি তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ, সেই তথ্য জনগণকে জানানো জরুরি।’
প্রশাসক বলেন, আগের জরিপে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কয়েকটি ওয়ার্ড এবার সেই তালিকায় নেই। ওই এলাকাগুলোতে কার্যক্রম জোরদার করার ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
ডিএসসিসি এলাকায় ডেঙ্গুতে মৃত্যু প্রসঙ্গে প্রশাসক বলেন, ঢাকা শহরে সারা দেশ থেকে মানুষ আসেন। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পরও অনেকে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়। এ কারণে হাসপাতালে ভর্তি রোগী কিংবা মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশের সময় অনেক ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রিক পরিসংখ্যান দেখা যায়।
আবদুস সালাম বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া, ডেঙ্গুতে একজন মানুষও যেন মারা না যান। এ লক্ষ্য থেকেই আমরা জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করেছি।’
ডিএসসিসি প্রশাসক আরও বলেন, জনগণ সচেতন হলে ডেঙ্গুর প্রভাব থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব। এ জন্য বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজের নিচে ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে।