রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের সি ব্লকের ১ নম্বর সড়কে ওপেক্স গার্মেন্টসের দক্ষিণ পাশের লিংক রোডে গতকাল শনিবারও ছিল আতঙ্কের ছাপ। খুনের আলামত হিসেবে সড়কের এক পাশে একটি সবজিবাহী ভ্যান ঢেকে রেখেছে পুলিশ। ভ্যানটির ওপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। আশপাশের দোকানপাট খুললেও মানুষের মধ্যে তখনো আগের রাতের গোলাগুলির আলোচনা।
শুক্রবারের রাতের ওই হামলায় যুবদল কর্মী মো. ইউসুফ আলী (পারভেজ) নিহত হন। আহত হয়েছেন সবজিবিক্রেতা নালাম সরদারসহ আরও দুজন। স্থানীয়দের ধাওয়ায় অস্ত্রসহ ধরা পড়েছেন চঞ্চল মোল্লা নামে এক হামলাকারী।
পুলিশ ও তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল টার্গেট ছিলেন কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু। তবে হামলাকারীরা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই ধরা পড়ে যাওয়ায় পালানোর সময় এলোপাতাড়ি গুলি চালান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, হামলাকারী চারজনই ঝিনাইদহ ও মাগুরা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। তাঁদের ভাড়াটে কিলার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে। গ্রেপ্তার চঞ্চল মোল্লার বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাড়ীপাড়া গ্রামে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। পলাতক তিনজন হলেন ঝিনাইদহের জিহাদ মোল্লা এবং মাগুরার শালিখা উপজেলার জিয়ারুল মোল্লা ও হাসান। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার কারণ হিসেবে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে দলীয় কোন্দল, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি এবং এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পুলিশ আলামত হিসেবে যে ভ্যানটি জব্দ করে রেখেছে, এর পাশেই দাঁড়ানো অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন সবজিবিক্রেতা নালাম সরদার।
নিহত ইউসুফ আলীর বড় ভাই সুমন বলেন, রাজনীতি করতে গিয়ে পরিবারে অনেক কথা শুনতে হয়েছে ইউসুফকে। শেষ পর্যন্ত রাজনীতি তাঁকে কিছুই দেয়নি; উল্টো দলীয় বড় ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণটাই গেল।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শরীফ নামে এক দোকানি বলেন, ‘রাত ১১টার একটু পর চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে পাই। সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারটি শব্দ হয়। সবাই ধর ধর বলে দৌড়াদৌড়ি করছিল। এর মধ্যেই আবার একটি শব্দ পাই। কিছুক্ষণ পর সামনে গিয়ে দেখি সবজিবিক্রেতা নালামের কপাল থেকে রক্ত ঝরছে, তার কপাল চেপে ধরেছে একজন। এর মধ্যে আরও দুজনকে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। একজনকে রাস্তায় ফেলে মারতেছিল।’
শরীফ আরও বলেন, পরে তিনি জানতে পারেন যে রাস্তায় ফেলে যাকে মারা হয়েছিল, সেই ব্যক্তিকে স্থানীয়রা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে।
রাতের ঘটনার পর পুলিশ দীর্ঘ সময় এলাকাজুড়ে অবস্থান নেয়। পরে সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ এবং আলামত জব্দ করে তদন্ত শুরু করে।
যাঁকে টার্গেট করে এসেছিল সন্ত্রাসীরা, সেই কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু আজকের পত্রিকাকে বলেন, শুক্রবার রাতে কয়েকজন নেতা-কর্মীকে নিয়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় ক্যাপ পরা এক যুবক দুইবার তাঁদের সামনে দিয়ে হেঁটে যান। কিছুদূরে আরও দুজন দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিষয়টি প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও ইউসুফ তাঁদের গতিবিধি দেখে সন্দেহ প্রকাশ করেন।
বাবুর ভাষ্য, পরে ওই যুবক বিপরীত পাশে এসে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাতে থাকেন। তখন ইউসুফ ও অন্যরা তাঁকে অনুসরণ করার বিষয়টি জানান। এরপর পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা নিজেদের মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা বলে দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
হাফিজুল বলেন, ইউসুফ একজনকে থামানোর চেষ্টা করলে তিনি কোমর থেকে পিস্তল বের করে খুব কাছ থেকে তাঁর বুকে গুলি করেন। একই সময় আরেক হামলাকারী তাঁকে লক্ষ্য করেও গুলি ছোড়েন। তিনি (হাফিজুল) নিচু হয়ে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান।
নিহত ইউসুফ আলীর রাজনৈতিক সহকর্মী মামুন বলেন, তাঁরা কয়েকজন চা খেতে খেতে আড্ডা দিচ্ছিলেন। চার-পাঁচজন অচেনা যুবক তাঁদের ঘিরে ঘুরছিলেন। তিনি বলেন, ‘ইউসুফ ভাই তাদের জিজ্ঞেস করেন, তোমরা আমাদের ঘিরে ঘুরছ কেন? তারা চলে যেতে চাইলে ইউসুফ ভাই একজনের হাত ধরে দাঁড়াতে বলেন। তখন ধাক্কা দিয়ে সরে গিয়ে ওই ব্যক্তি পিস্তল বের করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। প্রথম গুলিটিই ইউসুফ ভাইয়ের বুকে লাগে।’
তদন্তে উঠে এসেছে, হাফিজুল ইসলাম বাবু আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই পদে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতারও আগ্রহ রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
তবে বাবু বলেন, তিনি কাউকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন না। কেউ তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবলে সেটি তাঁদের বিষয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, ভাষানটেক, কাফরুল ও মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় চাঁদাবাজি, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ আয়ের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। ১৮ জুলাই কাউসার মোল্লা নামে এক যুবককে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বর্তমান ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তে দেখা হচ্ছে।
হত্যার ঘটনায় ইউসুফ আলীর মেজ ভাই মাসুদ রানা কাফরুল থানায় একটি মামলা করেছেন। মামলায় চঞ্চল মোল্লাসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে গতকাল সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেলে মিরপুর-১৩ নম্বরে জানাজা শেষে মরদেহ বরিশালের উজিরপুরে গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়েছে।
কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।