আসন্ন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন কামারেরা। কামারের দোকানগুলোয় ভিড় বেড়েছে ক্রেতাদের; বেড়েছে কোরবানির পশু জবাইয়ে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য তৈরির কাজ। এর মধ্যে বঁটি, ছুরি, চাপাতি ও কুড়াল অন্যতম। রাজধানীর কদমতলী ও যাত্রাবাড়ীতে অবস্থিত বেশ কয়েকটি কামারের দোকানে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
কামারদের অনেকে জানান, একসময় গ্রাম ও শহরে কামারদের ছিল জমজমাট ব্যবসা। দোকানও ছিল অনেক। কিন্তু এই আধুনিক যুগে অনেকটাই বিলুপ্তির মুখে কামার সম্প্রদায়ের মানুষ। কারখানার অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি, চীন থেকে আমদানি, অনলাইন বিক্রি এবং কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ায় কামারদের চাহিদা কমে গেছে।
ফলে এই পেশা ছেড়ে অনেকে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন। অনেকে আবার বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। শহর হলেও তাঁদের অনেক দোকানে এখনো রয়েছে আদি আমলের ভাট্টির মাধ্যমে লোহা গলানোর পদ্ধতি। তবে বেশির ভাগ কামারই তাঁদের সন্তানদের এই পেশায় আনতে রাজি নন বলে জানান।
কদমতলী থানার শনির আখড়ার পলাশপুরে প্রধান রাস্তার পাশেই রয়েছে সাত থেকে আটটি কামারের দোকান। এখানে একটি দোকানের মালিক সুজন কর্মকার (৩৯)। তিনি এক মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তিনি ও তাঁর দুই সহযোগী ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পশু কাটার বিভিন্ন পণ্য তৈরিতে। তাঁদের একজন ভাট্টির রশি ধরে টেনে বাতাস দিচ্ছেন। সুজন ও তাঁর অন্য সহযোগী মিলে লোহা তাপ দিয়ে লাল করছেন।
সুজন বলেন, ‘আমি প্রায় ২৫ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। আমার বাপ-দাদাও এই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে এই ব্যবসা আগের মতো নেই। কোরবানি ঈদ এলে কিছুটা ব্যস্ত থাকতে হয়। আর সারা বছর কোনো রকম চলে। শুধু বাপ-দাদার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এটা করছি।’ তবে তিনি তাঁর সন্তানদের এই পেশায় আনবেন না বলে জানান।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মীরহাজিরবাগের ব্যবসায়ী বিবেক কর্মকার (৫৫)। তিন পুত্রসন্তানের জনক বিবেকের গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী। তাঁর দোকানের সামনে টেবিলের মধ্যে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন সাইজের ছুরি, চাপাতি, বঁটি, কুড়ালসহ অসংখ্য লোহা ও ইস্পাতের তৈরি পণ্য। এসব পণ্য তৈরিতে ব্যস্ত দোকানের মালিক বিবেকসহ তাঁর কর্মচারীরা। ক্রেতারাও আসছেন পণ্য কিনতে। কেউ আসছেন তাঁদের পুরোনো পণ্যগুলো আরেকটু ঝালিয়ে নিতে। সব মিলিয়ে অনেকটা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিবেকসহ তাঁর কর্মচারীরা
বিবেক বলেন, ‘এটা আমার বাপ-দাদার পেশা। আমি ছোটবেলা থেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। বাবার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। প্রায় ৪০ বছর ধরে এই পেশায় আছি। একসময় এই ব্যবসা প্রচুর লাভবান ছিল। জিনিসপত্রের দাম কম থাকলেও ব্যবসা ছিল ভালো। সে সময় এসব পণ্য ব্যবহারকারীরা পণ্য তৈরির জন্য বা কিনতে ছুটে আসতেন কামারদের কাছে। কিন্তু শিল্পায়নের এই যুগে কারখানায় অত্যাধুনিক মেশিনে তৈরি হচ্ছে এসব লোহা ও ইস্পাতের পণ্য। শুধু তা-ই নয়, চীনের তৈরি এই ধরনের বিভিন্ন পণ্যও আসছে দেশে। এ ছাড়া অনলাইনে বিক্রি তো আছেই। এ ছাড়া সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে আমাদের চাহিদা অনেক কমে গেছে।’
বিবেক আরও বলেন, ‘সারা বছর আমাদের বেচাকেনা তেমন হয় না। ভবিষ্যতে বাপ-দাদার এই পেশা হয়তো ধরে রাখা যাবে না। আমার সন্তানদের লেখাপড়া করাই। তাদের এই পেশায় আনব না। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে অর্ডার বা চাহিদা একটু বেশি থাকায় এ কাজে সহযোগিতা করার জন্য আমার বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া বড় ছেলেকে নিয়ে আসি।’
রায়েরবাগ থেকে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে এসেছেন শহীদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর কোরবানির ঈদেই আমরা চাপাতি, ছুরিসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে আসি। এবারও নিলাম। তবে দাম গতবারের তুলনায় একটু বেশি।’
কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ থেকে সরঞ্জাম ঝালিয়ে নিতে আসেন জাহিদ। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই আমরা এখান থেকে পুরোনো ছুরি, চাপাতিসহ গরু কাটার কাজে ব্যবহার করা সরঞ্জাম ঝালিয়ে নিতে আসি।’
বাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, একটি চাপাতির মূল্য আকারভেদে ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, একটি ছুরির মূল্য আকারভেদে ২৫০ থেকে ৬০০ টাকা, একটি ছোট থেকে বড় বঁটি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় এবং কুড়াল বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে এক হাজার টাকায়।