‘পারিবারিকভাবে বাবা-মা, নানা-নানির সম্মতিতেই আত্মীয়তার মধ্যে বিয়ে হয়েছে। আইন সম্পর্কে জানতাম, তারপরও পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়েটি করেছি। বয়স পূর্ণ হলে সেটি রেজিস্ট্রি করা হবে।’
কথাগুলো বলছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে যেখানে স্কুলের শিক্ষকদের ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে নিজ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে বিয়ে করেছেন তিনি। এই প্রতিবেদককে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘অনেকে এভাবে বিয়ে করছে। আমি করেছি, তাতে দোষ কোথায়?’
বাংলাদেশের যেসব জেলায় বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি, সেগুলোর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ একটি। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এমআইসিএস সর্বশেষ ২০২৫-এর জরিপ অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৮ বছরের আগে মেয়েশিশুর বিয়ে হওয়ার হার ৬২ শতাংশ। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসন এ বিষয়ে তেমন কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না বলেই বাল্যবিবাহ বাড়ছে।
জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পাঁচ উপজেলায় অন্তত ১৬টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, বন্ধ হওয়া অধিকাংশ বাল্যবিবাহ পরবর্তীকালে গোপনে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এর জন্য কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু অঙ্গীকারনামা নিয়ে কাজ সম্পন্ন করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
গোমস্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকির মুন্সী জানান, চলতি বছরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ অভিযানে কারও বিরুদ্ধে জেল বা জরিমানা করার তথ্য নেই।
যদিও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী নারী এবং ২১ বছরের কম বয়সী পুরুষের বিয়ে অবৈধ। এই আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি শিশু বিয়ে করলে বা বাল্যবিবাহে অংশ নিলে তার সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
গত ৩১ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার এক মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই উপজেলার এক তরুণের বিয়ের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিনিধি গিয়ে তা বন্ধ করেন। বাবা-মায়ের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা (মুচলেকা) নেওয়া হয়, যাতে মেয়ের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত বিয়ে না দেওয়া হয়। জানা গেছে, পর দিনই গোপনে সেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। ওই তরুণ বলেন, ‘বাল্যবিবাহ আইনত অপরাধ—এটা জানতাম, তারপরও করেছি।’
অনুসন্ধানে জানা যায়, জেলার পাঁচ উপজেলাতেই প্রায় নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন বাল্যবিবাহ বন্ধ করছে, মুচলেকা নিচ্ছে, কিন্তু কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পরই গোপনে সম্পন্ন হচ্ছে সেই বিয়ে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর প্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় মেয়ের বাবার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায় না, আবার ছেলের বাড়িতেও নববধূকে পাওয়া যায় না। অনেক পরিবার বিয়ের বিষয়টিই অস্বীকার করে। ফলে মামলা বা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ এন এম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ‘বাল্যবিবাহের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার বা স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেলে পুলিশ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে গোপনে সম্পন্ন হওয়ায় এবং পরিবারগুলো বিষয়টি অস্বীকার করায় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসলাম-উদ-দৌলা বলেন, ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শুধু অভিযান নয়, অভিযানের পরবর্তী নজরদারি, নিয়মিত অনুসরণ এবং প্রয়োজন হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি। এক্ষেত্রে সামাজিক বাস্তবতা ও বিয়ে পরবর্তী মেয়ের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনেরও পরিবর্তন করা প্রয়োজন।’