২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগর থেকে কিছু ট্রলারে পচা ইলিশ নিয়ে ফেরার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ উঠেছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে গভীর সাগরে অবস্থান করে এসব মাছ শিকার করেছেন জেলেরা। দীর্ঘদিন বরফজাত করে রাখায় ইলিশের বড় একটি অংশ পচে গেছে।
চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি জানান, আজ শনিবার চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাটে দেখা যায়, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে একে একে ঘাটে নোঙর করছে ইলিশবোঝাই ট্রলার। এসব ট্রলার থেকে ঝুড়িভর্তি ইলিশ নামিয়ে আড়তে নেওয়া হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মাছ বেচাকেনা। কিছু মাছ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর জন্য গাড়িতে তোলা হচ্ছে। এরই মধ্যে পচা মাছের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ঘাটে।
ট্রলারভর্তি ইলিশের উৎস জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাগর থেকে ফেরা এক জেলে জানান, নিষেধাজ্ঞার খবর শুনে গত ৮ অক্টোবরের আগে বরফ, তেল ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে তাঁরা গভীর সাগরে মাছ শিকারে যান। এরপর নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন সাগরে অবস্থান করে মাছ শিকার করেন। দীর্ঘদিন বরফের মধ্যে সংরক্ষণ করায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাছ পচে গেছে।
সমুদ্রগামী ট্রলারের মাঝি নুর মোহাম্মদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে সামরাজ মৎস্যঘাটের বেশ কয়েকজন আড়তদার বলেন, এসব মাছ সাগরের। ২২ দিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে জেলেরা সাগরে মাছ শিকার করেছেন।
সামরাজ মৎস্যঘাটের সভাপতি আজিজ বলেন, ‘প্রশাসনের উদাসীনতার কারণে কিছু জেলে সমুদ্রে গিয়ে মাছ শিকার করেছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল।’
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সাগরগামী ট্রলারগুলো ইলিশবোঝাই হয়ে ঘাটে ফিরে আসা কতটা সম্ভব—এমন প্রশ্নে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ‘কিছু অসাধু জেলে গোপনে সমুদ্রে যেতে পারেন। আর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় সমুদ্রে নজরদারি করে কোস্ট গার্ড।’
এদিকে চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছ বাজারে পচা ইলিশ বিক্রির জন্য সংরক্ষণ করায় এক মাছ ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
শনিবার দুপুরে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল ইমরান অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, অভিযানে পচা ইলিশ বিক্রির জন্য সংরক্ষণের অপরাধে ব্যবসায়ী মো. নজরুল ইসলামকে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইনে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জব্দ পচা ইলিশ ধ্বংস করা হয়েছে।
এ দিকে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে আজ শনিবার মধ্যরাত থেকে সাগর ও নদীতে কার্যকর হচ্ছে জাটকা আহরণে আট মাসের নিষেধাজ্ঞা। আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং মৎস্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় ২৫ সেন্টিমিটারের ছোট ইলিশ (জাটকা) আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এর আগে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে প্রজননক্ষম ইলিশ রক্ষায় ‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান-২০২৬’ বাস্তবায়ন করা হয়।
এ সময় ডিমওয়ালা ইলিশ থেকে নিঃসৃত ডিমের পরিস্ফুটনের মাধ্যমে উৎপাদিত ইলিশের পোনা তার বয়সের একটি নির্দিষ্ট সময় (৫-৮ মাস) পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় নদ-নদী ও মোহনাসমূহে বিচরণ করছে। আর এ সময় ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও টেকসই নিষিক্ত ইলিশের পোনা রক্ষা করা অত্যাবশ্যকীয়। এসব পোনা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারলেই ভবিষ্যতে দেশের ইলিশ উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ (সংশোধিত) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী, উক্ত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে অনধিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর সারা দেশে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) ও স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতায় কঠোরভাবে এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করবে।