গাদাগাদি করে শ্রেণিকক্ষে বসা, ধুলাবালুতে কাপড় নষ্ট আর বৃষ্টি এলে ভিজে নষ্ট হয় বই-খাতাসহ বিভিন্ন কাগজপত্র। এমন পরিবেশে ৯ বছর ধরে পাঠদান চলছে বান্দরবানের থানচি উপজেলার টুকটংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন ভবন নির্মাণকাজ শুরু হলেও, তা এখনো শেষ হয়নি। ফলে ভোগান্তিও যাচ্ছে না শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে নারী তিনজন। ভাঙাচোরা ঝুপড়ি টিনশেড ও জরাজীর্ণ বেড়ার ঘরে ৬৪ জন শিক্ষার্থীকে পাঠদান করাচ্ছেন তাঁরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায় শ্রেণিকক্ষ। এদিকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারও নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন তলাবিশিষ্ট একটি স্কুলভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়; কিন্তু ঠিকাদারের ধীরগতির কারণে কাজ এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। কয়েকবার মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। সর্বশেষ মেয়াদ ধরা হয়েছে জুন ২০২৬ পর্যন্ত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজটি করছে বান্দরবানের মিল্টন ট্রেডার্স।
গত মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মাণাধীণ ভবনটিতে চারজন শ্রমিক করছেন। সেখানে থাকা মিস্ত্রি মো. জুয়েল বলেন, দরজা-জানালা এখনো ঠিক হয়নি, সিঁড়িতে রেলিংয়ের হাতল লাগানো হয়নি, আসবাবপত্রসহ বাকি রয়েছে অনেক কাজ। আরও এক বছরের মতো লাগবে।
টুকটংপাড়ার প্রধান মাংসান ম্রো বলেন, ‘সরকার টাকা দিয়েছে, কাজ শুরু হয়েছে। তবু চার বছরেও শেষ হয় না। ঠিকাদার-ইঞ্জিনিয়াররা সব সময় দায় এড়ানো কথা বলে।’
শিক্ষার্থী মানরাও ম্রো, এনয়া ম্রো, মেনয়াং ম্রো, মেনসায় ম্রো বলে, বাতাস এলে চোখে ধুলা পড়ে। পাশে অন্য ক্লাসের স্যার জোরে পড়ালে আমাদের লেখা ভুল হয়ে যায়।
সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য টিমপাও ম্রো (অভিভাবক) বলেন, ‘এত টাকা খরচ করে স্কুলভবন বানানো হয়েছে শুনেছি, কিন্তু আমাদের সন্তানেরা আজও ঝুপড়ি ঘরে বসে পড়াশোনা করে।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা চেইথেরুং ত্রিপুরা বলেন, ‘ভাঙাচোরা বেড়ার রুম আলাদা হলেও একই জায়গায় একাধিক শ্রেণি পরিচালনা করতে গিয়ে আমরা চরম সমস্যায় পড়ছি। শিক্ষার্থীরা মনোযোগ হারাচ্ছে। শিক্ষক হিসেবেও আমাদের রেজিস্টার ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এভাবে দীর্ঘদিন পাঠদান করলে শিক্ষার গুণগত মান বজায় রাখা সম্ভব নয়।’
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিক গুংগাবি ত্রিপুরা বলেন, ২০০৮ সালে গ্রামবাসীর উদ্যোগের স্কুলটি স্থাপিত হয়। ২০১৭ সালে জাতীয়করণের পর স্কুলের কোনো সংস্কার বা মেরামতের প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ভারপ্রাপ্ত সোনা মৈত্র চাকমা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কয়েকবার জানিয়েছি। দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপজেলা প্রকৌশলী (অ. দা.) মো. আবদুর হানিফ বলেন, ‘নির্মাণের সময়সীমা পেরিয়ে যাচ্ছে, আমরা সব সময় ঠিকাদারকে কাজটি শেষ করতে বললেও ঠিকাদার আমাদের কথা শোনেন না।’
ঠিকাদার সংস্থা মিল্টন ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. খোকন আহম্মেদ বলেন, ‘নির্মাণসামগ্রীর মূল্য অতিরিক্ত ও শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি হওয়া আস্তে আস্তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আগামী জুনের মধ্যে যেমন করে হোক কাজ শেষ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করব।’