নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানিকে ইজারার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতিতে গতকাল শনিবার আট ঘণ্টা অচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। কর্মবিরতির কারণে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরে আমদানি ও রপ্তানির পণ্যবাহী কনটেইনার ওঠানামা বন্ধ ছিল।
লাইটার জাহাজের সংকটে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় বন্দরের বহির্নোঙরে তৈরি হওয়া জাহাজজট পরিস্থিতি এই কর্মবিরতিতে আরও তীব্র হয়েছে। আজ রোববারও ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতির কর্মসূচি রয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীদের।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ গত বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া চার শ্রমিকনেতাকে গতকাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করা হয়েছে। তাঁরা বিএনপিপন্থী শ্রমিক দলের নেতা বলে জানা গেছে। বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে দুই দিন ৮ ঘণ্টা করে এই কর্মবিরতির কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। হাইকোর্ট গত বৃহস্পতিবার এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি-সম্পর্কিত চলমান প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট খারিজ করেন। চুক্তি করার প্রক্রিয়াটিকে বৈধ ঘোষণা করেন উচ্চ আদালত। এই আদেশের খবর চট্টগ্রাম বন্দরে ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার বন্দর ভবনে অফিস চলাকালে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। শনি ও রোববার সকাল ৮টা থেকে ৮ ঘণ্টা করে কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়। সেদিনই বন্দর কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে অফিস চলাকালে মিছিল, মহড়া এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়ে দেয়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন, সভা-মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী দ্রুত বিচার আইন, ২০০২; সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ১৯৯১সহ সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী সুস্পষ্ট পেশাগত অসদাচরণ ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রীয় স্বার্থবিরোধী।
চট্টগ্রাম বন্দরে গতকাল সকাল ৮টা থেকে শ্রমিক-কর্মচারীদের পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি শুরু হয়। এতে বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজে যোগ দেননি বন্দরের কর্মচারী ও বেসরকারি শ্রমিকেরা। ফলে জিসিবি টার্মিনাল, সিসিটি ও এনসিটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো এবং ওঠানোর কার্যক্রম বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এতে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কনটেইনার পড়ে থাকে। তবে এনসিটির বেসরকারি ডিপো থেকে আনা রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলার কার্যক্রম চলে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডার) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন সিকদার আজকের পত্রিকাকে বলেন, গতকাল সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো যায়নি। এতে আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত হয়েছে। ৮ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫০০ কনটেইনার ওঠানামা করতে পারেনি। রোববারও ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি হলে অনেক রপ্তানি পণ্য ফেলে জাহাজ চলে যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে কর্মবিরতি চলার সময় ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার গ্রহণ করা হচ্ছে।
রুহুল আমিন সিকদার বলেন, বন্দরে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টায় ২১টি ডিপো থেকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ কনটেইনার জাহাজীকরণ করা হয়। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ আমদানি পণ্যের কনটেইনার ডিপোতে আসে। অচলাবস্থার কারণে গতকাল ৮ ঘণ্টায় সেই কাজ অর্ধেকে নেমেছে। এ সময়ের মধ্যে তারা শুধু রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করেছে।
জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাসকারী বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী জানান, গতকাল কর্মবিরতি চলাকালে বন্দর জেটিতে জাহাজে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো যায়নি। জেটিতে মাত্র একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং দুটি সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ছিল। কর্মবিরতির কারণে কোনো কনটেইনার খালাস হয়নি। সাধারণত দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।
দুই সপ্তাহ ধরে লাইটার জাহাজ সংকটে বন্দরে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় বহির্নোঙরে তীব্র জাহাজজট তৈরি হয়েছে। গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরে ১০৮টি জাহাজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল। এগুলোর মধ্যে বহির্নোঙরে ছিল ১০৩টি জাহাজ। বন্দরের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত বন্দরে ৩০ থেকে ৩৫টি জাহাজ অপেক্ষায় থাকে।
বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যুগ্ম আহ্বায়ক শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, এনসিটি বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিবাদে গতকাল বন্দরের কর্মচারীদের ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতিতে বন্দরের সব ধরনের কাজ বন্ধ থাকে। বেলা ১১টায় কর্মচারীরা বন্দরের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল ও সমাবেশ করেন। আজও ৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি চলবে।
এদিকে কর্মবিরতির মধ্যেই গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের চার কর্মচারীকে জরুরি ভিত্তিতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ পার্সোনেল অফিসার স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
বদলি করা চারজন হলেন অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও পরিদর্শন বিভাগ), ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকন (১ম শ্রেণি-নৌ বিভাগ), উচ্চ হিসাব সহকারী মো. আনোয়ারুল আজিম (অর্থ ও হিসাব বিভাগ), এস এস খালাসী মো. ফরিদুর রহমান (প্রকৌশল বিভাগ)। আন্দোলনকারীদের মধ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালনকারীদের মধ্যে তাঁরা উল্লেখযোগ্য বলে জানা গেছে।
বদলি আদেশে এই চারজনকে গতকাল বিকেলেই বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের আজ নতুন কর্মস্থল অর্থাৎ পানগাঁওয়ে যোগ দিতে বলা হয়েছে। এই বদলি নিয়ে বন্দরে নানা গুঞ্জন চলছে।
বদলি হওয়া ব্যক্তিদের একজন ও সিবিএর সাবেক প্রচার সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, বদলি করা হলেও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের বিষয়টি তাঁদের হাতে। তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। তাঁদের এই বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা না হলে আন্দোলন আরও জোরদার হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক রাত ৮টায় আজকের পত্রিকাকে বলেন, এটি নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়ার অংশ। আন্দোলনের সঙ্গে এই বদলি প্রক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে এই আদেশ জারি হয়েছে।