চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়সংলগ্ন অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, শিক্ষক ও গবেষকেরা এসব ভাষা রক্ষায় সমন্বিত ও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তজুড়ে গারো, হাজং, কোচ, বানাইসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। স্থানীয়দের ভাষ্য, হাতিসহ বন্য প্রাণীর আক্রমণ, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে তাদের জীবনযাপন করতে হয়। এই বাস্তবতায় সবার পক্ষে শিশুদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অবশ্য সীমিত হলেও বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠদানের সুযোগ আছে। বিদ্যালয়ে না যাওয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মধ্যে নিজ নিজ মাতৃভাষার চর্চা কমে যাচ্ছে।
শেরপুরের সীমান্ত অঞ্চলের স্থানীয় শিক্ষক ও গবেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীর পরিবারে শিশুদের সঙ্গে বাংলা ভাষায় কথা বলার প্রবণতা বাড়ছে। টেলিভিশন, মোবাইলভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ- মাধ্যম ও অ্যাপের আধেয় মূলত বাংলা বা অন্য প্রভাবশালী ভাষার। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার স্থান নেই। ঘর বা পাড়ার বাইরে দৈনন্দিন জীবনেও মাতৃভাষার ব্যবহার সীমিত। এসব কারণে গারো, হাজং, কোচসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে নিজের মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের শহরমুখী অভিবাসনকেও ভাষা হারানোর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অধিকারকর্মীদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর ২০১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য পাঁচটি মাতৃভাষায় পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাঠপর্যায়ে এর সুফল মিলছে সীমিত আকারে। স্থানীয় শিক্ষকদের অভিযোগ, চলতি বছর অনেক বিদ্যালয়ে সময়মতো মাতৃভাষার বই পৌঁছায়নি।
মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (এমএলই) কর্মসূচির আওতায় পরিচালিত একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পরিমল কোচ বলেন, ‘আমাদের কোচ সম্প্রদায়সহ জাতিগোষ্ঠীগুলোর অনেকেরই নিজস্ব ভাষা রয়েছে। নিয়মিত পড়াশোনা ও চর্চা না থাকলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এই ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাবে। সরকারের কাছে অনুরোধ, ভাষাগুলো টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
বারোমারি সেন্ট লিও স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা অগ্নেশ সরেন বলেন, ‘একটি জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান ভিত্তি তার নিজস্ব ভাষা। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। আগে গারো ভাষার পাঠ্যপুস্তক পাওয়া গেলেও এ বছর কোনো বই পাইনি। অন্য বইয়ের মতো বছরের শুরু থেকে নিজস্ব মাতৃভাষার বইগুলো হাতে পেলে শিশুদের পাঠদান করা সহজ হয়।’
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান, লোকগান ও ধর্মীয় প্রার্থনায় মাতৃভাষার ব্যাপক ব্যবহার ছিল। এখন সেই পরিসর সংকুচিত হওয়ায় নিজেদের ভাষার ব্যবহারও সীমিত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গারো ও হাজং সম্প্রদায়ের শিক্ষিত তরুণেরা বেশি শহরমুখী হওয়ায় গ্রামে এ দুটি নৃগোষ্ঠীর জনসংখ্যাও কমছে। শিশুদের মাতৃভাষা শেখার অনুকূল পরিবেশও ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস শেরপুর জেলার তিনটি উপজেলায় প্রায় এক দশক ধরে মাতৃভাষাভিত্তিক প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এমএলই কর্মসূচির আওতায় জেলাজুড়ে প্রায় ৪০টি স্কুলে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা চর্চা করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারিতাসের নালিতাবাড়ী উপজেলা সমন্বয়কারী হিলারিয়ুস রিছিল বলেন, ‘গারো, হাজং ও কোচ সম্প্রদায়ের শিশুদের আমরা প্রাথমিক শিক্ষার আগে মাতৃভাষা শেখার সুযোগ দিতে কাজ করছি। তবে বৃহৎ পরিসরে সরকারি সহায়তা ছাড়া এসব ভাষা সংরক্ষণ সম্ভব নয়।’
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রচলিত মোট ৪৬ ভাষার মধ্যে ৪০টিই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে।
ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান ভাষাগুলো সংরক্ষণের তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যেসব ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, সেগুলোর উপাত্ত সংগ্রহ ও ভাষা-নথিভুক্তকরণ করা হচ্ছে। ভাষা টিকিয়ে রাখতে গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানো জরুরি।’