ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ও সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার কারণে এক শিক্ষক ও ইমামকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনের আগে নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ করায় গতকাল সোমবার সিলেটের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলার্সহোমের এক শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ায় গত শনিবার রাতে এক মসজিদের ইমামকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।
জানা গেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি সিলেটের শাহি ঈদগাহ এলাকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলার্সহোমে শিক্ষকদের স্কিল ডেভেলপমেন্টের একটি প্রশিক্ষণ চলছিল। তখন হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হন সিলেট-১ আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তখন তিনি সেখানে নির্বাচনী বক্তব্য দেন। সেখান থেকে তিনি যাওয়ার পরে উপস্থিত কলেজের অধ্যক্ষসহ সবার সামনে এই ঘটনার প্রতিবাদ করেন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. রিয়াজ উদ্দিন। তিনি তখন তাঁদেরকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কথাও জানান।
পরে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে স্কলার্সহোমের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীর আহমদ কাদেরী (অব.) রিয়াজ উদ্দিন ডেকে তাঁর কক্ষে নেন। পরে সেখানে চাকরি থেকে অপসারণের একটি পত্র দিয়ে কাল থেকে আর কলেজে না আসার জন্য বলেন।
এ বিষয়ে মো. রিয়াজ উদ্দিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আজকে আমাকে প্রিন্সিপাল ডেকে নিয়ে কিছু সিনিয়র শিক্ষকদের সামনে কাল থেকে না আসার জন্য একটি পত্র দিয়ে বলেন, ওই দিন আপনি যা করেছেন, তা ঠিক করেননি। আসলে ওই দিন আমাদের একটি ট্রেনিংয়ে হঠাৎ করেই মুক্তাদির সাহেবকে নিয়ে আসেন প্রিন্সিপাল স্যার। এই ট্রেনিংয়ে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তখন মুক্তাদির সাহেব যাওয়ার পরে আমি অধ্যক্ষকে বলি, এখানে এই নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গ করে উনাকে আনা ঠিক হয়নি। আনলে সব প্রার্থীকে নিয়ে আসতেন। এভাবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন হয় এবং আমাদের অনেকেই নির্বাচনী দায়িত্বে রয়েছি। তখন আমাকে অধ্যক্ষ কিছু বলেননি। গতকাল কলেজ খুলেছে। আজকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে চাকরিতে না আসার কথা বলেন। আমি ওই দিন ওই প্রতিবাদ না করলে এমনটি হতো না। এটি কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠানের ঠিক হয়নি। আমার সাথে অন্যায় করা হয়েছে।’
এ ব্যাপারে জানতে কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুনীর আহমদ কাদেরীকে বারবার ফোন দিলেও পাওয়া যায়নি। তাঁর ব্যবহৃত তিনটি সিমে কল, টেক্সট দিয়েও পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে কল দিলেও সাড়া মেলেনি। পরে তাঁকে না পেয়ে কলেজের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নাজিম মজুমদারকে বারবার কল, টেক্সট দিলেও পাওয়া যায়নি। যার কারণে প্রতিষ্ঠানের কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মাসুদ রানা বলেন, ‘এ বিষয়ে শুনেছি। অভিযোগ পেলে সেটার সত্যতা যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেওয়ায় মাসুম আহমদ নামের এক ইমামকে চাকুরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) কোনো নোটিশ ছাড়াই এশার নামাজের পর তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন মসজিদের মোতোয়ালি ফয়জুর রহমান।
এর আগে ৯ ফেব্রুয়ারি সিলেট-৪ আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জয়নাল আবেদীনের শেষ নির্বাচনী জনসভায় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার টুকের বাজার কলেজ মাঠে বক্তব্য দেন মাসুম আহমদ। মাসুম আহমদ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা খেলাফত মজলিসের সভাপতি। সে হিসেবে ওই জনসভায় তিনি বিশেষ অতিথি ছিলেন।
মাসুম আহমদ বলেন, ‘২০ বছর ধরে উপজেলার তৈমুর নগর ভাঙ্গারপাড় ক্রাশারমিল জামে মসজিদে আমি ইমামতি করছি। কখনো কারও সাথে আমার সমস্যা হয়নি। গত শনিবার রাতে হঠাৎ মসজিদের মোতোয়ালি আমাকে ফোন দিয়ে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘কালকে থেকে আর আপনাকে আসতে হবে না। আমাদের আগের সম্পর্কই ঠিক থাকবে। কিন্তু আমরা এখানে আপনাকে রাখতে পারছি না। সব মিলিয়ে আমি যতটুকু দেখেছি, মূলত কলেজ মাঠে বক্তব্য দেওয়ার পর থেকেই এই সমস্যা হয়েছে। রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে এভাবে চাকরি ছাড়তে হবে বলে আমি জানতাম না। বিভিন্ন মারফতে জানতে পারলাম, আমি যদি উপজেলা জমিয়তের একজন সিনিয়র নেতার সাথে বসে এটা শেষ করি, তাহলে আমার চাকরি থাকবে। এটা কী ধরনের কথা?’
তৈমুর নগর ভাঙ্গারপাড় ক্রাশারমিল জামে মসজিদের মোতোয়ালি ফয়জুর রহমান বলেন, ‘পঞ্চায়েতের সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে বলা হয়েছে উনাকে না আসার জন্য জানিয়ে দিতে। আমরা উনাকে হাসি মুখে বিদায় দিয়েছি। আসলে আর কিছু আমি জানি না। উনাকে উনার এই মাসের বেতনও দেওয়া হয়েছে। উনার সাথে আমাদের কোনো মনোমালিন্য হয়নি। উনার সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া বিষয়ে আমি কিছু জানি না। এখানে পলিটিক্যাল কিছু নেই।’