পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের আমেজ। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু-বিহু উপলক্ষে রাঙামাটিতে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় পর্বের তিন দিনব্যাপী বর্ণিল অনুষ্ঠানমালা। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে রাঙামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।
সকালে আনন্দঘন পরিবেশে বেলুন উড়িয়ে উৎসবের উদ্বোধন করেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার।
উদ্বোধন শেষে পৌরসভা প্রাঙ্গণে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও পাংখোয়া সম্প্রদায়ের নৃত্যশিল্পীরা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশন করেন। আদিবাসীদের নিজস্ব সুর ও নাচের ছন্দে পুরো এলাকা এক উৎসবমুখর জনপদে পরিণত হয়।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে শহরজুড়ে বের করা হয় এক ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এটি রাঙামাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শিল্পকলা একাডেমিতে এসে শেষ হয়।
রং-বেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন ও ঐতিহ্যবাহী সাজে সজ্জিত হয়ে শত শত মানুষ এই মিছিলে যোগ দেন। শোভাযাত্রা থেকে পুরোনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানি মুছে ফেলে নতুন বছরকে আবাহন করার আহ্বান জানানো হয়।
উল্লেখ্য, তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হচ্ছে, যা আগামী কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লায় উৎসবের আমেজে চলতে থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত সচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণচন্দ্র চাকমা। এ ছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
বাংলার নতুন বছরকে বরণ, পুরোনো বছরকে বিদায় জানাতে পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো এই উৎসব পালন করে থাকে। ৩০ চৈত্র হয় মূল অনুষ্ঠান। তার আগের দিন ২৯ চৈত্র নদীতে ফুল ভাসিয়ে পুরোনো বছরকে বিদায় জানানো হয়। ১ বৈশাখ নতুন বছরকে বরণ করা হয়। এ তিন দিনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।
সাংগ্রাই জল উৎসব
কাপ্তাই উপজেলার চিৎমরম ইউনিয়নের চিংম্রং বৌদ্ধবিহার মাঠে ১৫ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সাংগ্রাই জল উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এতে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটবে বলে আশা করছেন উৎসব উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক উথোয়াই মং মারমা। তিনি জানান, বৌদ্ধ সম্প্রদায়সহ নানা বর্ণের মানুষের কাছে একটি পবিত্র তীর্থস্থান চিৎমরম। এখানে রয়েছে শত বছরের চিংম্রং বৌদ্ধবিহার। প্রতিবছর বর্ষবরণ ও বর্ষ বিদায়কে ঘিরে বিহারসংলগ্ন মাঠে অনুষ্ঠিত হয় সাংগ্রাই জল উৎসব। এদিন মারমা যুবক-যুবতীরা পরস্পরকে পানি ছিটানোর মাধ্যমে বিগত বছরের দুঃখ, গ্লানি, ব্যর্থতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করবেন।
এ ছাড়া এদিন অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী মারমা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা এবং সাংগ্রাই শোভাযাত্রা।