হোম > শিল্প-সাহিত্য

যে শহরের প্রায় সবাই-ই লেখক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

পেড মল এরিয়া হলো শহরের প্রাণকেন্দ্র। ছবি: সিএনএনের সৌজন্যে

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের শান্ত ও ছিমছাম এক শহর আইওয়া সিটি। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দশটি সাধারণ শহরের মতোই মনে হতে পারে, কিন্তু এখানকার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বই আর লেখার গন্ধ। এটিকে বলা হয় মার্কিন সাহিত্যের এক ‘ইঞ্জিন রুম’ বা পাওয়ার হাউস, যেখান থেকে প্রায় শিল্পকারখানার মতো নিয়ম করে প্রতি বছর বের হয়ে আসছেন বিশ্বমানের সব লেখক।

২০০৮ সালে আমেরিকার প্রথম ‘ইউনেসকো সাহিত্য নগরী’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই শহরের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ বই, লেখালেখি আর সৃজনশীলতার চর্চা।

প্রতিবেদকের বর্ণনায় বইয়ের দোকানে ভিড়

আইওয়া সিটির বিখ্যাত স্বতন্ত্র বুকশপ ‘প্রেইরি লাইটস বুকস’-এর ওপর তলায় প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে একদল তরুণ পাঠক। লাউডস্পিকারে বাজছে ব্রিটনি স্পিয়ার্সের গান। গান শেষ হতেই মঞ্চে এলেন লেখক ক্যান্ডিস উইলি। তিনি তাঁর সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘আল্ট্রান্যাচারাল’ থেকে পাঠ করে শোনালেন—যেখানে একজন পপ তারকার উত্থান ও শোবিজ জগতের অন্ধকার গলিতে হারিয়ে যাওয়ার গল্প উঠে এসেছে।

পাঠ শেষে শুরু হলো প্রশ্নোত্তর পর্ব। আর এখানেই আইওয়া সিটির আসল রূপটি প্রকাশ পায়। এখানকার শ্রোতারা সাধারণ পাঠক নন; তাঁদের বেশির ভাগই উদীয়মান লেখক। তাঁদের প্রশ্নগুলো কেবল ‘আইডিয়া কোথায় পেলেন’ ধরনের সাধারণ প্রশ্ন নয়, বরং লেখার কৌশল, সম্পাদনার সূক্ষ্ম নিয়ম ও শৈলী নিয়ে তৈরি জটিল জিজ্ঞাসা।

লেখক ক্যান্ডিস উইলি বলেন, ‘এখানকার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। ক্র্যাফট এবং রেফারেন্সের ব্যাপারে এখানকার সবাই এত বেশি শিক্ষিত যে, মাঝে মাঝে প্রশ্ন শুনে নার্ভাস হয়ে যেতে হয়।’

শহরের উত্তর প্রান্তের পুরোনো বইয়ের দোকান ‘দ্য হন্টেড বুকশপ’-এর মালিক নিয়াল সিলভান বলেন, ‘এই শহরের প্রায় প্রত্যেকেই কোনো না কোনো বই লেখার কাজে ব্যস্ত, এবং আপনি রাস্তায় হাঁটলেই সেই আবহটি অনুভব করতে পারবেন। আমি অন্তত একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারকে চিনি, যাঁর আঙুলে সব সময় কলমের কালি লেগে থাকে।’

৯০ বছরে ‘আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপ’

আইওয়া সিটির এই সাহিত্যিক আবহের মূল চালিকাশক্তি হলো ‘আইওয়া রাইটার্স ওয়ার্কশপ’। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি তার ৯০তম বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছে। ১৯৩৬ সালে ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম ‘ক্রিয়েটিভ রাইটিং’ বা সৃজনশীল লেখালেখির ডিগ্রি চালু করে।

পরবর্তী সময়ে এই ওয়ার্কশপ বিশ্বজুড়ে তুমুল খ্যাতি অর্জন করে। আধুনিক মার্কিন সাহিত্যের দিকপাল যেমন—কার্ট ভনেগাট, ফিলিপ রথ, রেমন্ড কারভার, ফ্ল্যানারি ও’কনর এবং কার্টিস সিটেনফেল্ডের মতো লেখকেরা এখানকার শিক্ষক বা শিক্ষার্থী ছিলেন। এখান থেকে পাস করা লেখকদের ঝুলিতে জমা হওয়া পুলিৎজার এবং ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের সংখ্যাও ঈর্ষণীয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল প্রকাশনা শিল্প বা পাবলিশিং হাব (নিউইয়র্ক) থেকে বহু দূরে, কৃষিজমি এবং সনাতন আমীশ সম্প্রদায় পরিবেষ্টিত এই শহরে এমন উদারপন্থী ও সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে ওঠা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।

শিক্ষার্থীদের শহর ও ‘৯০ দিনের স্বর্গ’

বছরের অধিকাংশ সময় আইওয়া সিটি মুখরিত থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের কোলাহলে। শহরের কেন্দ্রস্থলে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত শপিং ও বিনোদন এলাকা ‘পেড মল’ যেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই বর্ধিত ক্যাম্পাস।

আইওয়া সিটির স্থানীয় শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন ‘লিটল ভিলেজ’-এর সম্পাদক জর্ডান সেলারগেন বলেন, ‘এখানে একটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও প্রগতিশীল সমাজ রয়েছে। আমাদের উপস্থাপনা কিছুটা রক্ষণশীল বা ভদ্র মনে হতে পারে, কিন্তু চিন্তাভাবনায় আমরা অত্যন্ত আধুনিক।’

তবে শিক্ষার্থীদের এই ভিড় স্থানীয়দের জন্য কখনো কখনো বিরক্তিকরও হয়ে ওঠে। সেলারগেন হেসে বলেন, ‘গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে যখন শিক্ষার্থীরা চলে যায়, তখন আমরা একে বলি “৯০ দিনের স্বর্গ”। শহরটি তখন শান্ত হয়ে যায়, সব জায়গায় পার্কিং পাওয়া যায় এবং পুরো শহরটাকে নিজের মনে হয়।’

ঐতিহ্যবাহী খাবার ও প্রেসিডেন্টদের আড্ডা

সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি আইওয়া সিটির রয়েছে নিজস্ব কিছু ঐতিহ্যবাহী খাবারের সংস্কৃতি। এরই একটি উদাহরণ ‘হ্যামবার্গ ইন নং ২’। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী ডাইনার বা রেস্তোরাঁ। এই রেস্তোরাঁ ‘পাই শেক’ (আইসক্রিম এবং আস্ত পাইয়ের টুকরো দিয়ে তৈরি ঘন মিল্কশেক)-এর জন্য বিখ্যাত।

এই রেস্তোরাঁটি এতটাই জনপ্রিয় যে ১৯৯২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান এখানে এসে আপেল পাই এবং আইসক্রিম খেয়েছিলেন। এ ছাড়া বিল ক্লিনটন এবং বারাক ওবামাও বিভিন্ন সময়ে এখানে এসে খাবার খেয়ে গেছেন।

‘স্টার ট্রেক’ এবং সায়েন্স ফিকশনের জাদুকরী প্রভাব

আইওয়া সিটি থেকে কিছুটা দক্ষিণে গেলে গ্রামীণ এলাকা ‘রিভারসাইড’ পাওয়া যায়। কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশন সিরিজ ‘স্টার ট্রেক’-এর ভক্তদের কাছে এই জায়গাটি অত্যন্ত পবিত্র। কারণ সিরিজের কাল্পনিক ইতিহাস অনুযায়ী, ২২২৮ সালের ২২ মার্চ এই রিভারসাইড শহরেই জন্ম নেবেন স্টারশিপ এন্টারপ্রাইজের বিখ্যাত ক্যাপ্টেন জেমস টি. কার্ক।

রিভারসাইডবাসী এই পরিচয়কে অত্যন্ত সানন্দে গ্রহণ করেছে। শহরের রাস্তায় স্টার ট্রেকের লোগো সংবলিত পেডেস্ট্রিয়ান ক্রসিং এবং পৌরসভার গাড়িগুলোতে ‘যেখান থেকে সেরা মহাকাশ যাত্রা শুরু’ স্লোগান লেখা রয়েছে।

সেখানে ঘুরতে আসা মিনেসোটার ট্যাটু আর্টিস্ট আলেহান্দ্রো নাভারো জানান, মায়ের মৃত্যুর পর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়ে যখন তিনি জীবন নিয়ে আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন, তখন স্টার ট্রেকের একটি পর্ব তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছিল। নাভারো বলেন, ‘কল্পকাহিনী বা ফিকশনের মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার এক অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে।’

ঐতিহ্যের রূপান্তর ও পুরোনো পানশালা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইওয়া সিটির বুকশপের সংখ্যা অবশ্য কমেছে। একসময় অসংখ্য বইয়ের দোকান থাকলেও এখন মূলত ‘প্রেইরি লাইটস’ এবং ‘দ্য হন্টেড বুকশপ’—এই দুটি স্বাধীন বুকশপই টিকে রয়েছে।

প্রেইরি লাইটস-এর সহ-মালিক জ্যান উইসমিলা বলেন, ‘আগে লেখকদের অনুষ্ঠানগুলোতে রকস্টারদের মতো ভিড় হতো। বিখ্যাত আইরিশ কবি সিমাস হিনি যখন এখানে এসেছিলেন, তখন ৮০০ মানুষের বসার জন্য বড় হলরুম ভাড়া করতে হয়েছিল। এখন মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার মতো এত কিছু রয়েছে যে এই সময় হিনি নিজে এলেও হয়তো ১৫০ জনের বেশি পাঠক পাওয়া যেত না।’

আইওয়া সিটির এই সাহিত্যিক সফরের শেষ গন্তব্য হতে পারে ‘ডেভ’স ফক্স হেড ট্যাভার্ন’। ইস্ট মার্কেট স্ট্রিটের এই পুরোনো কোণায় অবস্থিত সাধারণ পানশালাটির ভেতরের অংশ গত কয়েক দশকেও বদলায়নি। এটি ছিল কার্ট ভনেগাট বা রেমন্ড কারভারের মতো বিশ্বখ্যাত লেখকদের আড্ডাস্থল। ক্যাশ-অনলি (শুধুমাত্র নগদ লেনদেন) পলিসিতে চলা এই পানশালার কাঠের টেবিলে বসেই হয়তো তাঁরা তাঁদের বিখ্যাত সব গল্প ও চরিত্রের প্লট সাজিয়েছিলেন।

আইওয়া সিটির প্রতিটি সড়ক, প্রতিটি টেবিল এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে কোনো না কোনো অসামান্য গল্প, যা প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করছে বিশ্ব সাহিত্যকে।

মধ্যরাতে টোকিওতে মুরাকামি উন্মাদনা—প্রকাশ পেল নারীপ্রধান চরিত্রের নতুন উপন্যাস

আখবারাত: ইউরোপে সংবাদপত্র চালুর আগেই মোগলদের ছিল বিস্ময়কর সংবাদ-নেটওয়ার্ক

সায়নীকে একটু রেহাই দিন!

বাংলা একাডেমির সেমিনার সিরিজে মানিক, রফিক আজাদ ও চন্দ্রাবতীকে স্মরণ

রাজধানীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিশ্ব সংগীত দিবস উদ্‌যাপন

‘সুফিয়া কামাল সম্মাননা’ পেলেন চিত্রশিল্পী হাশেম খান

কবি সুফিয়া কামালের জন্মদিন উদ্‌যাপন করল কচি-কাঁচারা

পর্দা নামল ৮ দিনব্যাপী নতুন নাটকের উৎসবের

কবি আল মুজাহিদী আর নেই

জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে তৈরি হবে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’