ইরান যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতিকে যখন ওলটপালট করে দিচ্ছে, তখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্দরে এক অদ্ভুত নীরবতা ও বিভাজন লক্ষ করা যাচ্ছে। গত বুধবার সকালে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ টেলিভিশনে ১০ মিনিটের একটি ভাষণে যা বলেছেন, তা শুধু স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, বরং গোটা বিশ্বের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভাষণের শিরোনামটি অত্যন্ত সাধারণ হলেও মর্মার্থ ছিল বারুদঠাসা। ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার হুমকি দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই সানচেজ এই সাহসিকতা দেখান। ট্রাম্পের ক্ষোভের কারণ ছিল, স্পেন তাদের ভূখণ্ডে অবস্থিত যৌথভাবে পরিচালিত দুটি সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানোর অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
সানচেজের এই অবস্থান তাকে ইউরোপের সেই বিরল নেতাদের কাতারে নিয়ে গেছে, যাঁরা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘বুলিং’ বা দাম্ভিকতাপূর্ণ আলোচনার শৈলীকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করার সাহস দেখিয়েছেন। ট্রাম্পের আলোচনার ধরনটি বরাবরই বিশৃঙ্খল, অপমানজনক এবং ইগোস্টিক হয়। কিন্তু সানচেজ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ মানেই অসংখ্য প্রাণের অপচয়, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
সানচেজের ভাষণের একটি বড় অংশ ছিল ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক নীতির বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘একটি সরকারের প্রধান কর্তব্য হলো তার নাগরিকদের জীবন রক্ষা করা এবং উন্নত করা, বৈশ্বিক সংঘাত থেকে মুনাফা লোটা বা কারসাজি করা নয়। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না যে, কিছু নেতা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে যুদ্ধের ধোঁয়াশাকে ব্যবহার করবেন এবং গুটিকয়েক মানুষের পকেট ভারী করবেন।’
তাঁর মতে, পৃথিবী যখন হাসপাতাল বানানো ছেড়ে ক্ষেপণাস্ত্র বানানো শুরু করে, তখন শুধু সেই নির্দিষ্ট কিছু মানুষই লাভবান হয়।
সানচেজ আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র বা পারস্পরিক শ্রদ্ধা গড়ে ওঠে না। ট্রাম্পের নাম না নিয়ে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, অন্ধ এবং দাসসুলভ আনুগত্য প্রদর্শন কোনো নেতৃত্ব হতে পারে না। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, স্পেনের মূল্যবোধ ও স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজে তারা অংশীদার হবে না, এমনকি তা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির প্রতিশোধের ভয়েও নয়।
স্পেনের সাধারণ মানুষের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা মাত্র ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ, ফলে সানচেজের এই অবস্থান দেশের ভেতরে তাকে ব্যাপক সমর্থন এনে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সময় তৎকালীন স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী হোসে মারিয়া আজনার যেভাবে বুশ প্রশাসনকে অন্ধ সমর্থন দিয়েছিলেন, সেই তিক্ত স্মৃতি এখনো স্প্যানিশদের মনে দগদগে।
তবে সানচেজের এই একাকী লড়াই স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। রক্ষণশীল পিপলস পার্টির নেতা আলবার্তো নুনিয়েজ ফেইজো অভিযোগ করেছেন, সানচেজ সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি করতে গিয়ে আমেরিকার সঙ্গে স্পেনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বিপন্ন করছেন। অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থী ‘ভক্স’ পার্টির নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল সানচেজকে আক্রমণ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্ত মূলত ‘আয়তুল্লাহ’দের দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু সানচেজের জন্য এমন কঠোর অবস্থান নেওয়া নতুন কিছু নয়। তিনি গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের অন্যতম কড়া সমালোচক এবং ভেনেজুয়েলায় আমেরিকার সামরিক হস্তক্ষেপেও তিনি বাধা দিয়েছিলেন। যখন গোটা ইউরোপ অভিবাসনবিরোধী কট্টর ডানপন্থী হাওয়ায় ভাসছে, তখনো সানচেজ অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থেকেছেন।
ইউরোপের অন্যান্য বড় শক্তির দিকে তাকালে সানচেজকে এই মুহূর্তে বেশ নিঃসঙ্গ মনে হয়। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের দাবির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে বাহবা পেলেও বার্লিন, প্যারিস বা রোমের কাছ থেকে সানচেজ এখনো পূর্ণ সমর্থন পাননি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গত বুধবার সানচেজকে ফোন করে সংহতি জানালেও তিনি নিজে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলছেন। মাখোঁর মেয়াদের মাত্র এক বছর বাকি, তাই তিনি সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে সংকট প্রশমনের চেষ্টা করছেন। মাখোঁ ইরানের ওপর হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বললেও ইরানের নেতৃত্বকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী করেছেন। তিনি খামেনি বা ইরানের কর্মকর্তাদের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ না করার কথাও স্পষ্ট করেছেন। বর্তমানে ফ্রান্স তাদের বিমানবাহী রণতরি ‘শার্ল দ্য গল’কে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করেছে, তবে মাখোঁ একে ‘সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক’ এবং কাতার-কুয়েতের মতো মিত্রদের সুরক্ষার জন্য বলে দাবি করেছেন।
সবচেয়ে হতাশাজনক অবস্থান দেখা গেছে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জের কাছ থেকে। গত মঙ্গলবার ওভাল অফিসে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বৈঠকের সময় মার্জ অত্যন্ত নমনীয় ছিলেন। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সময় নয়। মার্জের কৌশল ছিল কানাডিয়ান প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির মতো বাস্তবিক হওয়া, যাতে ইউক্রেন ইস্যু এবং ট্রাম্পের এলোপাতাড়ি শুল্কনীতি থেকে জার্মানিকে রক্ষা করা যায়। নিজ দেশে কট্টর ডানপন্থী এএফডি পার্টির জনপ্রিয়তা এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির চাপে থাকা মার্জ কোনোভাবেই ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে জড়াতে চাননি। এমনকি ট্রাম্প যখন স্পেনের সমালোচনা করছিলেন, তখন মার্জ স্পেনকে সমর্থন না করে উল্টো ট্রাম্পের দাবিকেই সমর্থন দিয়ে বলেন, ন্যাটোর সদস্যরাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। মার্জ পরে জার্মান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি ব্যক্তিগত আলোচনায় স্পেনের পক্ষে কথা বলেছেন, কিন্তু ততক্ষণে কূটনৈতিক ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। ট্রাম্প সফলভাবে ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়েছেন।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও একধরনের দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করছেন। তিনি একদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বড়াই করেন, অন্যদিকে ইউরোপের স্বার্থের কথাও বলেন। মেলোনি বলেছেন, তাঁরা যুদ্ধে জড়াতে চান না এবং বিশ্ব বর্তমানে বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে ইতালির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো পার্লামেন্টে সরাসরি বলেছেন, ইরানের ওপর এই হামলা আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করেই শুরু করা হয়েছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ইরান অভিযানের জন্য ইতালির সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের কোনো অনুরোধ আমেরিকা থেকে আসেনি।
এই মুহূর্তে ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্পেনের এই দ্বৈরথ এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছিলেন, স্পেন তাদের সিদ্ধান্ত বদলে এখন অভিযানে সহযোগিতা করতে রাজি হয়েছে। কিন্তু স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস অত্যন্ত রূঢ়ভাবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘লেভিট হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হতে পারেন, কিন্তু আমি স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আমি বলছি, যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান একচুলও নড়েনি।’
ইউরোপের বড় দেশগুলো যখন নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থে ট্রাম্পের সামনে নতজানু হওয়ার পথ বেছে নিচ্ছে, তখন পেদ্রো সানচেজ নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে একাকী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই লড়াই শেষ পর্যন্ত স্পেনকে কতটা কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে ফেলবে, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।