হোম > বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-নেপালের নির্বাচন, মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎসহ নতুন বছরে দ. এশিয়ায় আলোচনায় থাকবে যে ৫ বিষয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে অন্যতম মূল খেলোয়াড় তারেক রহমানের বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ছবি: এএফপি

পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি একটি উত্তাল বছর পার করেছে। স্বাভাবিকভাবে তাই ২০২৬ সালে মসৃণ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকবে পুরো অঞ্চল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অঞ্চলটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাতের এক চরম ঝুঁকি নিয়ে নতুন বছরে পা রাখছে। কারণ, এটি এখন এক অস্থির বিশ্বব্যবস্থার অস্বস্তিকর প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করছে।

২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার গতিপথ নির্ধারণ করবে, এমন পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো—

বাংলাদেশ ও নেপালে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন

২০২৬ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ও নেপালে উচ্চ ঝুঁকির জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দুই দেশের অজনপ্রিয় নেতা—বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এটিই হবে প্রথম ভোট। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি দেশ ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে উচ্চাভিলাষী সংস্কারের দিকে মনোযোগ দেয় এবং এক বছর অপেক্ষার পর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে, যা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব নেওয়া নেপালের অস্থায়ী প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করে, যা ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। দেশটি বর্তমানে পুরোপুরি নির্বাচনের প্রস্তুতিতে নিমগ্ন।

যদি এই দুই দেশের বিশালসংখ্যক ভোটার মনে করেন, নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না অথবা যদি তাঁরা নির্বাচিত সরকারকে পছন্দ না করেন, তবে নতুন করে অস্থিরতার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ এবং নেপাল উভয় দেশেই বর্তমানে চরম উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। মূলত তরুণ প্রজন্মই আগের নেতাদের পতন ঘটিয়েছিল এবং তারা নির্বাচনকে সুশাসন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি অনিবার্য ধাপ হিসেবে দেখছে।

যদি এই তরুণেরা মনে করেন, তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না, তবে তাঁরা আবারও রাজপথে নেমে আসতে পারেন। এই দুই দেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখা ভারত ও চীন এই নির্বাচনের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখবে।

পাকিস্তান ও তার প্রতিবেশী দেশসমূহ

বিদায়ী বছরে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের একটি সংক্ষিপ্ত সামরিক সংঘাত হয়েছে এবং আফগানিস্তানের সঙ্গেও প্রায় একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালে ইসলামাবাদ দুই প্রতিবেশীর সঙ্গেই শত্রুতার ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত; সামান্য কোনো উসকানিও যেমন কোনো সন্ত্রাসী হামলা, সীমান্তে অনুপ্রবেশ কিংবা ভারতের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প আবারও যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

এদিকে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে সীমান্তপারের সন্ত্রাসী হামলা বন্ধে বাধ্য করতে কিংবা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তান। এর ফলে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে সন্ত্রাসীদের দমনে পাকিস্তানের টেকসই সামরিক অভিযান এবং তার বদলে তালেবানদের পাল্টা হামলার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে।

কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টা আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনে তেমন কাজে আসেনি, যদিও আগামী বছর তারা চেষ্টা চালিয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তবে নয়াদিল্লি তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করায় সেই সম্ভাবনা শুরুতেই নাকচ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার কঠিন কাজটি পাকিস্তান ও তার প্রতিবেশীদেরই করতে হবে, কোনো বাইরের শক্তিকে নয়।

মালদ্বীপের অর্থনীতি

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক দুটি অর্থনৈতিক সংকটের উৎস ছিল এই দক্ষিণ এশিয়া। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ঋণখেলাপিতে পরিণত হয় এবং ২০২৩ সালে পাকিস্তান কোনোমতে সেই পরিস্থিতি এড়িয়ে যায়। এখন মালদ্বীপ চরম সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে। যদি তারা এই চাপ মোকাবিলা করতে না পারে, তবে এটিই হয়তো পরবর্তী শ্রীলঙ্কা হতে যাচ্ছে।

অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, মালদ্বীপ ‘ঋণের উচ্চ ঝুঁকির’ মুখে রয়েছে। এর কারণ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ এবং বিশাল অঙ্কের ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতার (যার বড় অংশই চীনের ঋণ) কথা বলা হয়েছে। আগামী বছর দেশটির পাবলিক ঋণ জিডিপির ১৩৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তান উভয়ের ক্ষেত্রেই ঋণের বোঝা এবং সংকুচিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। মালদ্বীপের জন্য সুখবর হলো, শক্তিশালী পর্যটন আয় এবং ভারতের মতো প্রধান সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ সহায়তার কারণে তারা এখন পর্যন্ত বড় বিপর্যয় ঠেকিয়ে রেখেছে। তবে দেশটির অর্থনীতি অত্যন্ত ভঙ্গুর হওয়ায় বৈশ্বিক পণ্যের দাম বৃদ্ধি কিংবা পর্যটন আয়ে সামান্য বিঘ্ন বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ভারতে নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়ালেও ভারতের চিত্র ভিন্ন। ২০১৪ সালে প্রথম নির্বাচিত হওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই অঞ্চলের দীর্ঘতম মেয়াদে দায়িত্ব পালনকারী নেতা। আগামী বছর মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়বে; বিশেষ করে ২০২৯ সালে তিনি চতুর্থ মেয়াদের জন্য লড়বেন কি না, তা নিয়ে।

মোদি এখনো বেশ জনপ্রিয় এবং ২০২৫ সালে তাঁর দল বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। যাঁরা আশা করেছিলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির প্রত্যাশার চেয়ে কম ফল মোদির পতনের শুরু হতে যাচ্ছে, তাদের জন্য এই জয়গুলো ছিল দাঁতভাঙা জবাব।

বিজেপি যদি আগামী বছরের রাজ্য নির্বাচনগুলোতেও ভালো ফলাফল করে; বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে যেখানে তারা দুর্বল, তবে মোদির সমর্থকেরা ক্ষমতায় টিকে থাকার বিরোধিতার দাবিকে আরও জোরালোভাবে উড়িয়ে দিতে পারবেন। মোদি অবসরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন—এমন কোনো ইঙ্গিত এখনো নেই, তবে ২০২৬ সালে পর্যবেক্ষকেরা কোনো বড় পরিবর্তনের সংকেত পান কি না, সেদিকে কড়া নজর রাখবেন।

ট্রাম্পের চীন নীতি

চীনের ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন আগামী বছর কী ধরনের নীতি গ্রহণ করে, তার ওপর দক্ষিণ এশিয়ার ভাগ্য অনেকটা নির্ভর করছে। এখন পর্যন্ত হোয়াইট হাউস বেইজিংয়ের ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট কৌশলের কথা জানায়নি; ট্রাম্প একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং সহযোগিতার সংকেত দিয়েছেন।

ট্রাম্পের চূড়ান্ত অবস্থান ঝুলে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, যেখানে চীনকে ঠেকানোর যৌথ আকাঙ্ক্ষাই ছিল এত দিনের কৌশলগত বন্ধন। যদি ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের প্রতি নমনীয় হয়, বিশেষ করে ট্রাম্প যদি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছান, তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইদানীং দক্ষিণ এশিয়াকে পরাশক্তিদের প্রতিযোগিতার চোখ দিয়ে দেখছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া ‘ইন্দো-প্যাসিফিক নীতির’ মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য মার্কিন অবকাঠামো চুক্তি বা অস্ত্র সহায়তার মতো নানা টোপ দেওয়া। চীনের প্রতি মার্কিন নীতি নরম হলে এসব দেশের ওপর চাপ কমে যাবে।

দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের রাজধানীগুলো এই পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে। কারণ, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রাখতে চায়। তবে এর ফলে ওয়াশিংটনের প্রতিকূলে থাকা বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপও বাড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: ফরেন পলিসি

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—নতুন বছরে চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ভারত

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কি তাঁর ছেলে এগিয়ে নিতে পারবেন?

২০২৫ সালে ট্রাম্প কয়টি দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন?

কোন স্বার্থে মুসলিমপ্রধান সোমালিল্যান্ডকে সবার আগে স্বীকৃতি দিল ইসরায়েল

নাইজেরিয়ায় কোন আইএসকে আঘাত করল মার্কিন বাহিনী

নাইজেরিয়ায় কেন হামলা চালাল মার্কিন বাহিনী, খ্রিষ্টান নিপীড়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী

‘ভেনেজুয়েলা সংকট’ কীভাবে আন্তর্জাতিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে

ভেনেজুয়েলার তেল আমাদের সম্পদ—ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবি কি যৌক্তিক

চীন চাইলে এক দিনেই ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে পারে, কিন্তু কীভাবে

‘ডেথ সেলে’ ইমরান খান—ক্রিকেট বিশ্বের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন