হোম > বিশ্লেষণ

নিজের শুরু করা সংঘাত ট্রাম্পের গলার কাঁটা, এখন বন্ধ করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য হারাবে যা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

হরমুজ প্রণালি। ছবি: নাসা

তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং তাঁর নিজস্ব মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন–মাগা সমর্থকদের চাপের মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে শুরু করা ইরান সংঘাত মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে ইরান যদি তাঁকে থামতে দেয়ও, ইরানিরা খুব অল্প কিছুতে এবার তুষ্ট হবে বলে মনে হয় না, তাহলেও এই লড়াই বন্ধ করলে ট্রাম্পকে তো বটেই যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের মূল্য চোকাতে হবে।

ইরানের বর্তমান রেজিমকে পুরোপুরি ভেঙে না দিয়েই যদি বর্তমান বাস্তবতায় ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করেন, বোমাবর্ষণ বন্ধ করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বিশাল বিমান ও নৌ-সম্পদ প্রত্যাহার করতে শুরু করেন, তবে তা অন্তত স্বল্প মেয়াদে বিশ্ববাজারকে শান্ত করবে এবং আরেকটি ‘চিরস্থায়ী সংঘাতের’ আশঙ্কায় থাকা আমেরিকান ভোটারদের আশ্বস্ত করবে।

কিন্তু ক্রুদ্ধ, উদ্ধত এবং পারমাণবিক মজুত ও অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের অস্ত্রাগার রয়ে যাওয়া ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা মূলত তেহরানকে বিশ্বের জ্বালানি বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার শামিল হবে। এটি আমেরিকার অংশীদার ও মিত্রদের নিরাপত্তাকেও বিসর্জন দেবে এবং সম্ভবত আরও বিধ্বংসী একটি আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে।

ওয়াশিংটনের অধৈর্য অবস্থান আঁচ করতে পেরে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, ইরানের শর্ত মেনে কোনো চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যাবেন; যার মধ্যে আমেরিকার পক্ষ থেকে তেহরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তও রয়েছে। মঙ্গলবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই আক্রমণকারীর মুখে আঘাত করতে হবে, যাতে সে শিক্ষা পায় এবং আমাদের প্রিয় ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় আক্রমণ চালানোর কথা কখনো চিন্তাও না করে।’

জিম্মি হয়ে পড়বে তেল

বিশ্বাস করা হয়, ইরানের কাছে এখনো প্রচুর পরিমাণে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে নৌ-মাইন, যা ব্যবহার করে তারা হরমুজ প্রণালিকে ট্যাংকার চলাচলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে পার হতো। গত বুধবারই এই এলাকায় তিনটি জাহাজ আক্রান্ত হয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা এবং ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো অ্যান্ড্রু ট্যাবলা বলেন, ‘যদি (ইরানে) এই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, এমনকি তা ভগ্নদশায় হলেও, তবে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনগুলোকে তাদের সুবিধাজনক সময়ে হরমুজ প্রণালির ট্যাংকার এবং আমেরিকার উপসাগরীয় মিত্রদের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে কে আটকাবে? জ্বালানি মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলার ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা হবে বিশাল।’

এর সঙ্গে আরেকটি নতুন মোড় হলো, ইরান তার বন্ধুদের (যেমন চীন) উপসাগর থেকে তেল নিতে দিচ্ছে, কিন্তু অন্য সবার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করছে।

তেহরান যেহেতু এখন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা এবং এর বৈশ্বিক প্রভাব প্রমাণ করেছে, তাই তারা নিজেদের জন্য একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার তৈরি করেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোকে ভবিষ্যতে তাদের তোষণ করার একটি কারণও দিয়ে রেখেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালিটি পুনরায় উন্মুক্ত করতে ইরানি উপকূল দখল করার জন্য একটি স্থল অভিযানের প্রয়োজন হতে পারে। সেটি হবে সংঘাতের একটি অনির্দিষ্টকালের বিস্তৃতি, যা আমেরিকানদের হতাহতের সংখ্যা অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে।

দুর্বল হয়ে পড়া আমেরিকান প্রভাব (Deterrence)

মার্কিন সামরিক বাহিনীর পারফরম্যান্স স্বাভাবিকভাবেই চীন এবং আমেরিকার এশীয় মিত্ররা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে উচ্চ-নির্ভুল আগ্নেয়াস্ত্রের প্রয়োগ করেছে, ইরানের ওপর আকাশসীমায় শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তাদের নৌ ও বিমানবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে।

তা সত্ত্বেও সংঘাতের ১২ দিন পার হলেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন নিক্ষেপ অব্যাহত রেখেছে, যদিও তা আগের চেয়ে ধীরগতিতে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং দুষ্প্রাপ্য কিছু সামরিক লক্ষ্যবস্তু, যেমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার রাডারগুলো নির্ভুল আক্রমণের মাধ্যমে ধ্বংস করার যে ক্ষমতা ইরান দেখিয়েছে, তা নজর এড়ায়নি। আমেরিকা যদি তার উপসাগরীয় অংশীদারদের অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলে রেখে চলে যায়, তবে তার অনিবার্য প্রভাব দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং তাইওয়ানেও পড়বে।

লন্ডনের সোয়াস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক স্টিভ সাং বলেন, ‘এই যুদ্ধ বিশ্বে মার্কিন মর্যাদাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্য এবং সামগ্রিকভাবে গ্লোবাল সাউথে চীনের নিজের প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ অনেক বেড়ে গেল।’

স্টিভ সাং আরও যোগ করেন, ‘এদিকে সবাই লক্ষ করছে যে ইরানের সামরিক ক্ষমতা বড়জোর মাঝারি মানের, তবু আমেরিকানরা তাদের পুরোপুরি দমাতে পারছে না।’

পারমাণবিক অস্ত্রের দৌড়

আবুধাবিতে কর্মরত রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ওমানে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্ক সিভার্স বলেন, ‘একবার যখন আমরা এটি শুরু করেছি, তখন এখান থেকে বের হওয়ার সহজ কোনো পথ নেই। এই শাসনব্যবস্থা তাদের সামরিক সক্ষমতার অনেকখানি হারিয়েছে, কিন্তু পরিষ্কারভাবেই সবটুকু নয়। যদি তারা টিকে থাকে, তবে তারা পুনর্গঠিত হওয়ার জন্য যা যা করা দরকার সব করবে এবং পুনরায় সেসব কর্মকাণ্ড শুরু করবে, যার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল।’

ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধতার খুব কাছাকাছি এবং গত জুনে আমেরিকার বিমান আক্রমণের পর মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, তা দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে রয়ে গেছে।

হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থায় পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালনকারী এবং নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের বিশেষজ্ঞ এরিক ব্রুয়ার বলেন, ‘খারাপ খবর হলো, আপনি ইরানকে এমন এক অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন, যেখানে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পেছনে তাদের উদ্দেশ্যও এখন আরও জোরালো হবে। এটি একটি বড় ঝুঁকি।’

শাসনব্যবস্থা যদি অবাধ্য থাকে, তবে এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস করার জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ স্থল অভিযানের প্রয়োজন হবে। মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান কাটুলিস বলেন, ‘আমেরিকা এবং ইসরায়েল এখন কেবল আকাশ ও নৌ শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রত্যক্ষ করছে।’

ব্রায়ান কাটুলিস আরও বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং ইরানের অবশিষ্ট পারমাণবিক মজুত নিরাপদ করার মতো কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোর জন্য স্থল সেনার প্রয়োজন হতে পারে, যদি কোনো কূটনৈতিক বিকল্প অনুসরণ করা না হয়। আমরা যা দেখছি, তা মূলত একটি অত্যন্ত বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সম্ভাবনা।’

ঝুঁকিতে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো

একটি দুঃস্বপ্নময় পরিস্থিতি, বিশেষ করে আমেরিকার উপসাগরীয় অংশীদারদের জন্য যারা এখন ইরানি আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আক্রমণ বন্ধ করে দেবে, কিন্তু ইরান এই তেলসমৃদ্ধ রাজতন্ত্রগুলোকে বশীভূত করতে ক্রমাগত হয়রানিমূলক আক্রমণ চালিয়ে যাবে। ভয় হলো, তেহরান তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, যাতে তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরিয়ে দেয় এবং আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা ছিন্ন করে, যে আমেরিকা তাদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম থিংকট্যাংকের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের বলেন, ‘বিপদ অনেক। একটি আহত ও ক্রুদ্ধ ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য মোটেও সুখকর নয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে আক্রমণ করার সক্ষমতার দিক থেকে ইরানকে অনেকটা পঙ্গু করে দিয়েছে, এটি ইরানকে মাত্র একটি বিকল্পই দিচ্ছে: উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করা এবং হরমুজ প্রণালিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র জয়ী অবস্থানে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ব্যাপারে আসলে কোথাও পৌঁছাতে পারেনি।’

উপসাগরীয় নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর তাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে আনছেন না, যারা তাদের এই যুদ্ধে টেনে এনেছে। এর আংশিক কারণ হলো, তাদের দেশগুলো ইরানি আক্রমণের পরবর্তী রাউন্ড থেকে বাঁচার জন্য আমেরিকান আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, যা চীন বা রাশিয়া দিতে পারবে না। তবু ভেতরে-ভেতরে অনেকেই ভাবছেন, আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা আসলে সম্পদের চেয়ে দায় বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে কি না, বিশেষ করে যদি ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে এবং সংঘাতের পর পুনরায় অস্ত্রসজ্জিত হয়।

বাহরাইনের ওআরএফ মিডল ইস্ট থিংকট্যাংকের ফেলো মাহদি ঘুলুম বলেন, ‘আমরা এমন দুটি ফলাফলের মধ্যে আটকে গেছি, যার প্রতিটিই অন্যটির চেয়ে খারাপ। একটি হলো বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকা এবং দ্বিতীয়টি হলো ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হওয়া। ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুরোপুরি চিন্তাভাবনা করে নেওয়া হয়নি, এই সংঘাতের সিদ্ধান্ত তাড়াহুড়ো করে নেওয়া হয়েছে এবং এর প্রভাবগুলো ভুলভাবে হিসাব করা হয়েছে।’

মাহদি ঘুলুম আরও বলেন, ‘যদিও উপসাগরীয়-আমেরিকান সম্পর্ক টিকে থাকবে, তবে কূটনৈতিক স্তরে অনেক হতাশা প্রকাশ পাবে।’

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

ইরান অভিযানের গোড়ায় গলদ, অন্ধকারে হাতড়াচ্ছেন ট্রাম্প

‘কাজ না করলে না খেয়ে মরব’—মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন

ইরান যুদ্ধ যেভাবে আরও জটিল, দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে

হরমুজ প্রণালি এত সহজে কীভাবে বন্ধ করতে পারল ইরান

ইরানের অল-আউট গেমপ্ল্যান: লক্ষ্য বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করে মার্কিন অহংকারকে নতজানু করা

ইরানে ইসলামিক রিপাবলিক ২.০ আসছে, কেমন হবে এটি

ইরান যুদ্ধের সাতপাকে আটকে গেছে ট্রাম্পের জয়

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ক্লাস্টার ওয়ারহেড, চ্যালেঞ্জের মুখে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ইরান থেকেই কি শুরু হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ

ইলেকট্রনিক যুদ্ধ: ইরানকে যেভাবে সহায়তা করছে চীন-রাশিয়া