পুরোনো হুমকি বাস্তবে রূপ দিয়ে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সামরিক নিরাপত্তা দিতে পারে। তবে এটি নিরাপদ রাখা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে তাদের জন্য। গত বছর লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হুতিরা যেভাবে নৌপরিবহন ব্যাহত করেছিল, তা তার প্রমাণ।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত বিশ্বব্যাপী তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে যায়। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখানে জাহাজ চলাচল ৯৭ শতাংশ কমে গেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এক কমান্ডার ২০১১ সালে বলেছিলেন, দেশটির জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা ‘এক গ্লাস পানি খাওয়ার চেয়েও সহজ।’ এর আগেও বহুবার এমন হুমকি দেওয়া হয়েছিল। এরপরও আইআরজিসি বারবার সতর্ক করেছে যে তারা প্রণালি বন্ধ করতে পারে। বিশেষ করে নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনার সময় ২০১৬ ও ২০১৮ সালে এবং গত বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময়ও একই হুমকি দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রণালি বন্ধ করা সব সময়ই ছিল চরম পরিস্থিতির শেষ অস্ত্র। কারণ, এতে ইরানের শত্রুরা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারে এবং পাল্টা হামলায় ইরানের নিজস্ব জ্বালানি খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইরানি কর্মকর্তারা এই যুদ্ধকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে বর্ণনা করছেন এবং ক্রমেই কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী।
ইরান ও ওমানের মাঝের এই সরু জলপথ উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কুয়েত, ইরান, ইরাক, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এটি সমুদ্রপথে একমাত্র রপ্তানি পথ। সোমবার তেলের দাম সাময়িকভাবে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। জাতিসংঘের মতে, উচ্চ তেলের দাম আবারও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট তৈরি করতে পারে, যেমনটি রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর দেখা গিয়েছিল।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সারের সংকটও তৈরি করতে পারে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে। বিশ্লেষণী সংস্থা কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৩৩ শতাংশ সার, বিশেষ করে সালফার ও অ্যামোনিয়া এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। দীর্ঘ যুদ্ধ ১৯৭০-এর দশকের মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সংকটের মতো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কাও বাড়াতে পারে।
এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথটি মাত্র দুই নটিক্যাল মাইল প্রশস্ত। জাহাজগুলোকে ইরানি দ্বীপপুঞ্জ ও পাহাড়ি উপকূলের বিপরীতে মোড় নিতে হয়, যা ইরানি বাহিনীর জন্য আড়াল তৈরি করে বলে জানিয়েছে শিপিং ব্রোকার এসএসওয়াই গ্লোবাল।
ইরানের নিয়মিত নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও বিপ্লবী গার্ডের হাতে এখনো বহু বিকল্প রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দ্রুতগতির আক্রমণ নৌকা, ক্ষুদ্র সাবমেরিন, নৌমাইন, এমনকি বিস্ফোরকবোঝাই জেটস্কিও। এমনটি বলেছেন ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডার টম শার্প।
গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেজিলিয়েন্সের মতে, তেহরানের প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। স্বল্প মেয়াদে প্রতিদিন তিন বা চারটি জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে পার করানো সম্ভব হতে পারে। এ জন্য সাত বা আটটি ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজের আকাশ প্রতিরক্ষা দরকার হবে এবং ক্ষুদ্র সাবমেরিনের ঝুঁকি কতটা কমানো গেছে তার ওপরও নির্ভর করবে। তবে মাসের পর মাস এভাবে টেকসই নিরাপত্তা দিতে হলে আরও বেশি সম্পদ লাগবে বলে জানান শার্প।
ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ভাসমান মাইন ব্যবহারের ক্ষমতা ধ্বংস হলেও আত্মঘাতী হামলার ঝুঁকি থেকেই যাবে বলে সতর্ক করেছেন মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক ইউরোপীয় ইনস্টিটিউটের পরিচালক আদেল বাকাওয়ান।
আরইউএসআই জার্নালের সম্পাদক কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ চললে কোনো না কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের তেল উপসাগর থেকে বের হওয়া জরুরি। তাই সুরক্ষার পরিকল্পনা চলছে।’
৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তেলবাহী জাহাজগুলোকে প্রণালি পার হতে নিরাপত্তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইতিমধ্যে হামলা হয়েছে এবং খুব অল্পসংখ্যক জাহাজই পার হতে পারছে। তিনি আরও জানান, শিপিং কোম্পানিগুলোকে বীমা ও আর্থিক গ্যারান্টি দিতে যুক্তরাষ্ট্র ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ, ভারত এবং এশিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্র যৌথ নিরাপত্তা মিশনের পরিকল্পনা করছে। তবে সংঘাত শেষ না হলে এমন অভিযান শুরু করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ফ্রান্স পূর্ব ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর এবং সম্ভাব্যভাবে হরমুজ প্রণালিতে প্রায় এক ডজন নৌযান মোতায়েন করছে। এর মধ্যে একটি বিমানবাহী রণতরিও রয়েছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জার্মানি ও ইতালির নেতাদের সঙ্গে প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষায় সহায়তার বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে তার দপ্তর। মার্কিন জেনারেল ড্যান কেইন পেন্টাগনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনা করছি।’ তবে বিস্তারিত জানাননি।
ইরানঘনিষ্ঠ ইয়েমেনের হুতিরা তুলনামূলক ছোট সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির অধিকাংশ জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন বাহিনী নিরাপত্তা দিলেও পুরোপুরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
ফলে অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি এখনো আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ ব্যবহার করছে। ডেনিশ শিপিং কোম্পানি মেয়ার্স্ক জানিয়েছিল, তারা জানুয়ারি থেকে ধীরে ধীরে সুয়েজ রুটে ফিরে আসা শুরু করবে। সোমালিয়ার উপকূলে জলদস্যু দমনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন বাহিনী তুলনামূলকভাবে সফল হয়েছে। তবে সেখানে প্রতিপক্ষ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের মতো শক্তিশালী ছিল না।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব প্রণালিকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য অতিরিক্ত তেল পাইপলাইন নির্মাণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়। ২০১৯ সালে হুতি মিলিশিয়ার হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বোঝা গেছে, বিকল্প পথগুলোও ঝুঁকিমুক্ত নয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স