হোম > বিশ্লেষণ

ইসরায়েল ইস্যুতে নির্বাচনী চাপ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ঐতিহাসিক বাঁক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আধুনিক মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম কট্টর ইসরায়েল-বান্ধব প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণায় বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র ভূ-রাজনৈতিক আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে ‘ফক্স নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে দেওয়া তাদের বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি (৪ বিলিয়ন) ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে যাচ্ছে।

বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) পররাষ্ট্রনীতির মূল স্তম্ভ ছিল ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি। সেই সর্বসম্মত নীতিতে ট্রাম্পের এই আকস্মিক মন্তব্য মার্কিন কৌশলগত অবস্থানের এক অভূতপূর্ব ফাটলকে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে এই ঘোষণা কি শুধুই ভোটদিনের রাজনৈতিক চমক, নাকি ওয়াশিংটনের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পূর্বাভাস—তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়।

যদিও স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ শেষে প্রাপ্ত ফলাফলে অধিকাংশ আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের এগিয়ে থাকার তথ্য মিলছে। এমনকি রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনার মতো এলাকায় তারা এরই মধ্যে আসন হারিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্য ও মূল বাস্তবতা

ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলার দিতাম। কিন্তু মাস কয়েক আগেই আমরা এটি বন্ধ করার চুক্তি করেছি...এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই, কারণ তারা এখন খুব সফল একটি দেশ। এই বছরের শেষ থেকেই আমরা ইসরায়েলকে আর অর্থ দেব না।’

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী ২০২৬ সালের শেষে এই অর্থ বন্ধ করতে হলে চুক্তি বাতিল করতে হবে, যা মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া আইনিভাবে প্রায় অসম্ভব।

এ ছাড়া, এই সহায়তার সিংহভাগই মূলত একটি ‘মার্কিন ভর্তুকি’ হিসেবে কাজ করে—কারণ ইসরায়েলকে দেওয়া এই অর্থ সরাসরি আমেরিকার অস্ত্র প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোতে ফিরে আসে। ফলে এটি হঠাৎ বন্ধ হলে মার্কিন সামরিক শিল্প এবং অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়বে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাপ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ঘোষণা কেবল ইসরায়েল-আমেরিকা সম্পর্কের বিষয় নয়, এটি সরাসরি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এক গভীর মেরুকরণের প্রতিফলন।

১. প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব: মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সাইয়েদের মতো প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট নেতারা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পেছনে মার্কিন জনগণের করের টাকা ব্যয় হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। ট্রাম্প তাঁর সাক্ষাৎকারে সরাসরি এই প্রগতিশীলদের কটাক্ষ করলেও, পরোক্ষভাবে তাঁদের উত্থাপিত যুক্তিকেই মেনে নিয়েছেন।

২. ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ‘মাগা’ শিবিরের চাপ: গাজা সংকট ও ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে ট্রাম্পের নিজস্ব ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (MAGA) সমর্থক ও ডানপন্থী পডকাস্টারদের মধ্যেও ইসরায়েলকে বিনা শর্তে সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধে অসন্তোষ বাড়ছে। সম্প্রতি কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা গেছে, রেকর্ড ৪৮ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে অতিরিক্ত সমর্থন দিচ্ছে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মূলত তাঁর নিজস্ব বিচ্ছিন্নতাবাদী বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জনভিত্তিকে সন্তুষ্ট করার একটি চেষ্টা।

নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত ধাক্কা

এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এল যখন ইসরায়েল নিজেই রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ ঝুলন্ত।

যদিও নেতানিয়াহু ইতিপূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইসরায়েল আগামী এক দশকের মধ্যে মার্কিন অনুদান থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চায়, তবুও ইরানের সঙ্গে চলমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যে ওয়াশিংটনের এই অনিশ্চিত বার্তা তেল আবিবের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত অস্বস্তি তৈরি করেছে।

পররাষ্ট্রনীতির প্রবীণ বিশেষজ্ঞ ব্রেট ম্যাকগার্কের মতে, ‘এটি তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক অক্ষ ভেঙে ফেলবে না। ইসরায়েল এখন একটি শক্তিশালী অর্থনীতি, তারা নিজেদের অর্থেই মার্কিন অস্ত্র কিনতে সক্ষম।’ তবে বড় প্রশ্ন হলো, মার্কিন কংগ্রেসে যদি ইসরায়েলবিরোধী জনমত জোরালো হয়, তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টরা অস্ত্র বিক্রির জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন পাবেন কিনা।

রাজনৈতিক নাটক নাকি বাস্তব পরিবর্তন?

সাবেক ওবামা প্রশাসনের চিফ অব স্টাফ রাম এমানুয়েল সম্প্রতি সতর্ক করেন, ‘গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে আমেরিকান জনগণের মনোভাবের পরিবর্তন কেবল ডেমোক্রেটিক পার্টির সমস্যা নয়, এটি আমেরিকার জাতীয় সমস্যা।’

ট্রাম্প প্রায়শই চরম সিদ্ধান্ত বা বক্তব্যের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে ভালোবাসেন। তাই নির্বাচনের দিন দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য হয়তো রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য নির্বাচনী ধাক্কা থেকে নজর ঘোরানোর একটি সামরিক-রাজনৈতিক চাল হতে পারে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার—আমেরিকার রাজনীতিতে ইসরায়েলের প্রতি দ্বিধাহীন ও বিনা শর্তে সমর্থনের দিন হয়তো শেষ হতে চলেছে, এবং এক অনিশ্চিত নতুন কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে।

ইন্দোনেশিয়ার দাবানল যেভাবে প্রতিবেশীদের রাজনৈতিক সংকটে ফেলছে

ফলাফল যা-ই হোক, নতুন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে—দাবি বিশ্বখ্যাত ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদের

সরকার গঠন নিয়ে সংকট, কিংমেকার আরবরাই—ইসরায়েলের সামনে চার পথ

কেন ইথিওপিয়ায় যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পাঠাচ্ছে রাশিয়া

রাশিয়ার ‘ছায়াযুদ্ধের’ ভয়ে তটস্থ ইউরোপ?

সার্বিয়ার স্ট্রংম্যান ভুচিচকে যেভাবে গদিচ্যুত করলেন ছাত্ররা

নিজ ভূমে পরবাসী: ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি আরব কারা, ক্ষমতা-রাজনীতি ও অধিকার আদায়ে তাদের সংগ্রাম

ইসরায়েলের নির্বাচন ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতির পরিবর্তন আনবে কি

বিশ্লেষকদের ভুল প্রমাণ করে ইসরায়েলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আরবরা