ভ্লাদিমির পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ হয়তো ‘শেষের দিকে’ এগোচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি আবারও পশ্চিমা দেশগুলোকেই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার জন্য দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দিয়ে পশ্চিমারা সংঘাতকে টিকিয়ে রেখেছে।
মস্কোয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়ের বার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে গতকাল রোববার পুতিন বলেন, তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। সেই বৈঠক মস্কোতে অথবা কোনো নিরপেক্ষ দেশে হতে পারে বলেও জানান তিনি।
পুতিনের মন্তব্য এমন সময়ে এল—যখন রাশিয়া ও ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত স্বল্পমেয়াদি তিন দিনের যুদ্ধবিরতি পালন করছে এবং যুদ্ধবন্দী বিনিময় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বড় পরিসরের শান্তি আলোচনা এখনো স্থবির অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে দুই পক্ষই একে অপরের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা রোববার জানান, রুশ হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ফ্রন্টলাইনে প্রায় ১৫০টি যুদ্ধ–সংঘর্ষ হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছে।
চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ ইউক্রেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে এবং রাশিয়ার অর্থনীতির ওপরও তীব্র চাপ তৈরি করেছে। ফলে উভয় পক্ষের ওপরই যুদ্ধ শেষ করার চাপ বাড়ছে। পুতিনের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুতিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিষয়টি শেষের দিকে এগোচ্ছে।’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত। তবে তিনি বলেন, জেলেনস্কির সঙ্গে তিনি তখনই বৈঠকে বসবেন, যখন শান্তিচুক্তির মূল শর্তগুলো আগেই চূড়ান্ত হয়ে যাবে। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুতিন, জেলেনস্কি ও ট্রাম্পকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ক্রেমলিন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল।
পুতিন বলেন, ‘এটি হওয়া উচিত চূড়ান্ত ধাপ, আলোচনার প্রক্রিয়া নয়।’ তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত বিজয়ের স্মরণে পালিত ‘বিজয় দিবস’ অনুষ্ঠান শেষে এ মন্তব্য করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইউরোপের সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে আলোচনায় তিনি প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দের আলোচনা সঙ্গী জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার।
শ্রোয়েডারের সঙ্গে পুতিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে জার্মানিতে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। ২০০৫ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি বিতর্কিত জার্মান-রুশ গ্যাস পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের চেয়ারম্যান হন। রাশিয়ার অভিযোগ, পশ্চিমা দেশগুলো ন্যাটো জোটকে সম্প্রসারণ করে রাশিয়াকে ঘিরে ফেলতে চেয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে হামলার অন্যতম যুক্তি হিসেবেও পুতিন এই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তাঁর ভাষায়, ন্যাটোর সম্প্রসারণ রাশিয়ার জন্য ছিল ‘জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।’
বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকেরা জানতে চান, ইউক্রেনকে পশ্চিমা সামরিক সহায়তা কি সীমা ছাড়িয়ে গেছে? জবাবে পুতিন বলেন, ‘তারাই রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত বাড়াতে শুরু করেছিল, যা এখনো চলছে।’ তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো ‘মাসের পর মাস অপেক্ষা করেছে, যেন রাশিয়া চূর্ণবিচূর্ণ পরাজয়ের মুখে পড়ে এবং রাষ্ট্র হিসেবে ভেঙে পড়ে। কিন্তু তা ঘটেনি।’ পুতিনের ভাষায়, ‘এরপর তারা সেই একই মানসিকতায় আটকে গেছে, এখন আর সেখান থেকে বের হতে পারছে না।’
বিশ্লেষক কিয়ার জাইলসের মতে, পুতিনের এই বক্তব্যকে সরাসরি যুদ্ধের সমাপ্তির সংকেত হিসেবে দেখা উচিত নয়। তাঁর মতে, এটি বাস্তবতার চেয়ে বরং বৈশ্বিক ‘আশা ও আশাবাদের’ প্রতিফলন বেশি। ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক চ্যাথাম হাউসের এই গবেষক বলেন, গত ১৮ মাসে বহুবার বলা হয়েছে যুদ্ধ শেষের পথে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবে রূপ নেয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, পুতিনের বক্তব্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না যে যুদ্ধ সত্যিই শেষ হতে যাচ্ছে।
জাইলসের ভাষায়, ‘সবচেয়ে ভালো যে সম্ভাবনাটি আমরা কল্পনা করতে পারি, তা হলো—পুতিন হয়তো এখন বুঝতে শুরু করেছেন যে রাশিয়া বাস্তবে যুদ্ধ জিতছে না।’ তিনি আরও বলেন, সে কারণেই পুতিন হয়তো আগের তুলনায় যুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বেশি আগ্রহী হতে পারেন। কারণ, আগে তিনি ট্রাম্পের সব শান্তি উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তখন তাঁর বিশ্বাস ছিল, যুদ্ধ চালিয়ে গেলে যুদ্ধবিরতির চেয়ে রাশিয়া বেশি লাভবান হবে।
এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। পূর্ব ইউক্রেনের বিশাল এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিও চাপে পড়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাও রুশ অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইউরোপের সঙ্গে মস্কোর সম্পর্ক এখন শীতল যুদ্ধের সবচেয়ে খারাপ সময়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে তারা এখনো পুরো দনবাস অঞ্চল দখল করতে পারেনি। অন্যদিকে ইউক্রেনের পাল্টা হামলাগুলোও বড় কোনো দখলকৃত এলাকা পুনরুদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পুতিনের এই মন্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র আবারও উভয় পক্ষকে অন্তত অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সমঝোতার দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। শুক্রবার ট্রাম্প প্রকাশ্যে সর্বশেষ তিন দিনের যুদ্ধবিরতিকে সমর্থন দেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এটি ‘যুদ্ধের সমাপ্তির সূচনা’ হতে পারে।
ট্রাম্প ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়টিকে অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি করেছিলেন। এমনকি তিনি দাবি করেছিলেন, পুনরায় ক্ষমতায় ফিরলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ থামাতে পারবেন। রাজনীতিবিদদের সময় গণনার নিজস্ব ঘড়ি থাকে বোধ হয়। সেখানে ২৪ ঘণ্টা কখনো কখনো কয়েক বছরও হয়ে যায়।
তবে এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি। কারণ রাশিয়া পুরো দনবাস অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় এবং ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে কিয়েভ কোনো ভূখণ্ড ছাড়তে রাজি নয়। একই সঙ্গে তারা যেকোনো চুক্তির অংশ হিসেবে নিরাপত্তা গ্যারান্টিও দাবি করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা