হোম > বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের শুল্ক আদালতের রায়ে অবৈধ, বাংলাদেশ এখন কী করবে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের মধ্যে বৈঠক। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার এক বিশেষ ঘোষণায় তিনি বিশ্বের সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ‘বৈশ্বিক শুল্ক’ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাঁর ‘সুরক্ষাবাদী’ নীতির এক আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে (৬-৩ ভোটে) প্রেসিডেন্টের আগের বিতর্কিত ‘পাল্টাপাল্টি শুল্ক’ নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। আদালত জানান, প্রেসিডেন্ট জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন-এর দোহাই দিয়ে এভাবে ঢালাও শুল্ক বা কর বসাতে পারেন না। কারণ, কর আরোপের ক্ষমতা একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। এই রায়ের ফলে গত বছর বাংলাদেশের ওপর আরোপিত ১৯-২০ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশের ওপর আরোপিত বিভিন্ন হারে বাড়তি শুল্কের আইনি ভিত্তি রাতারাতি ধসে পড়ে।

তবে রায়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ‘ধারা ১২২’ ব্যবহার করে নতুন প্রোক্লেমেশনে স্বাক্ষর করেন। এই ধারাটি প্রেসিডেন্টকে ‘বিরাট ও গুরুতর’ ব্যালেন্স অব পেমেন্ট (লেনদেনের ভারসাম্য) সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ ১৫০ দিনের জন্য ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সাময়িক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয়।

হোয়াইট হাউসের ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন এই ১০ শতাংশ ‘অ্যাড ভ্যালোরম’ (পণ্যের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে) শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা ১ মিনিট (ইএসটি) থেকে কার্যকর হবে। এটি প্রাথমিকভাবে ১৫০ দিন স্থায়ী হবে। মেয়াদ বাড়াতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) এই শুল্ক সংগ্রহ করবে।

তবে মার্কিন অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব এড়াতে বেশ কিছু পণ্যকে এই শুল্কের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদ; জরুরি ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল; কৃষিপণ্য যেমন গরুর মাংস, টমেটো এবং কমলা; টেলিযোগাযোগ ও মহাকাশ গবেষণা সরঞ্জাম; বই ও অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত সামগ্রী।

বাংলাদেশের জন্য প্রভাব: স্বস্তি নাকি নতুন শঙ্কা?

প্রথমে বাংলাদেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ। সে সময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে সেই শুল্কহার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। তবে শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত মতে পৌঁছাতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলতে থাকে। গত ৯ মাসে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত দর-কষাকষি শেষে উভয় পক্ষ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ।

চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করছে, সেটা পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশ কী কী কেনাকাটা ভবিষ্যতে বাড়াবে, সেটা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে ১৪টি।

১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫০০ কোটি ডলারের।

বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে ৩৫০ কোটি ডলারের।

আদালত ট্রাম্পের শুল্ক বাতিল করায় বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যেমন:

১. শুল্কের হার হ্রাস ও প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা: বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর শুল্কের হার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়েছে। তবে চুক্তির ফলে আমদানিকৃত মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাকে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। যদিও অন্যান্য তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে শুল্ক ১৯ শতাংশই থাকবে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আগের হার বাতিল হওয়ায় এবং নতুন শুল্ক ১০ শতাংশ নির্ধারিত হওয়ায় রপ্তানিকারকদের জন্য খরচ প্রায় অর্ধেক কমে আসবে। তবে অন্যান্য দেশের জন্যও একই হারে শুল্ক প্রযোজ্য হওয়ায় ভারত বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ বাজারে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

২. আগের শুল্ক ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা: আইনি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত এক বছরে অবৈধভাবে সংগৃহীত প্রায় ১০০ থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার শুল্ক ফেরত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা যদি গত এক বছরে কয়েক শ কোটি ডলার বাড়তি শুল্ক দিয়ে থাকেন, তবে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে; যা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে দেশের জন্য বড় উদ্দীপনা হতে পারে।

৩. পোশাক খাতের ঝুঁকি: হার কমলেও অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক মার্কিন বাজারে পণ্যের খুচরা মূল্য বাড়িয়ে দেবে। একটি ১০ ডলারের টি-শার্টের দাম ১১ ডলার হয়ে গেলে মার্কিন ক্রেতাদের চাহিদা কমে যেতে পারে। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ৪৬ লাখ শ্রমিকের (যাদের ৮০ শতাংশ নারী) কর্মসংস্থান ও আয় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

ভারতের জন্য কতটা স্বস্তির?

ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতেই রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্ক থেকে ১৮ শতাংশ ছাড় নিশ্চিত করেছে ভারত। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলা থেকে তেল আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নয়াদিল্লি। তবে নতুন ১০ শতাংশ বিশ্বব্যাপী শুল্ক কার্যকর হওয়ার ফলে ভারতের প্রকৃত শুল্কের হার দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৩ দশমিক ৫ শতাংশের কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সুবিধা এনে দেবে। নতুন শুল্কের ফলে প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত চাপের বোঝা হ্রাস পেয়েছে, যা ভারতের মোট জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, রত্ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত এই সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের স্বস্তি পাবে। ধারণা করা হচ্ছে, উচ্চ শুল্কহারের কারণে ভারতের যে ৪-৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা ছিল, তা এই ঘোষণার ফলে এড়ানো সম্ভব হবে। ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬-৬.৫ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল থাকবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

তবে ভারত যদি তার তেলের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে পুনরায় উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে অভ্যন্তরীণ সংস্কার, করছাড় এবং বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বড় ধরনের আইনি ধাক্কা খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় বিশ্ববাণিজ্যে নতুন অস্থিরতা তৈরি করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল শুক্রবার এক বিশেষ ঘোষণায় তিনি বিশ্বের সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ‘বৈশ্বিক শুল্ক’ আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্ব অর্থনীতিতে তাঁর ‘সুরক্ষাবাদী’ নীতির এক আগ্রাসী প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ভারতের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর থাকলেও বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চিত্রটি বেশ উদ্বেগের। বিশেষ করে যারা কৃষি ও বস্ত্র খাতের রপ্তানির জন্য মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

এসব দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় প্রায় ৮৯ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেতে পারে (জিডিপির প্রায় ০.৭%)। এর ফলে বিশেষ করে শ্রম-নিবিড় খাতে কর্মরত নারীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ছাড়া ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রাজিলের মতো রপ্তানি-নির্ভর দেশগুলোর জিডিপি ০.৬ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাপী মন্দারও আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন চাহিদা হ্রাসের ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত রপ্তানি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মুদ্রার অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে আফ্রিকা ও এশিয়ার স্বল্পোন্নত এবং ছোট দ্বীপ দেশগুলো। বিকল্প বাজার না থাকায় এবং মার্কিন প্রতিশোধমূলক শুল্কের ভয়ে এই দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। সামগ্রিকভাবে, মার্কিন শুল্ক নীতি বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে দেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা রিসিপ্রোকাল শুল্ক চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন আপাতত স্থগিত রাখা উচিত। যেহেতু নতুন শুল্কের মেয়াদ মাত্র ১৫০ দিন, তাই এই সময়ের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে বিশেষ ছাড় আদায়ের চেষ্টা করতে হবে।

এ ছাড়া এককভাবে মার্কিন বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে বাংলাদেশকে। অর্থাৎ রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনয়ন ছাড়া এ ধরনের বাণিজ্য বাধা কাটিয়ে ওঠা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববাণিজ্যে এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে, যার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে আগামী জুনে মার্কিন কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত।

গোপন হত্যাচেষ্টা, কেলেঙ্কারি, ৪ বছর যুদ্ধের পরও কীভাবে টিকে আছেন জেলেনস্কি

বর্ষা বিপ্লব: বাংলাদেশের বহু বিজয়ের গল্প এবং সহযোগিতায় ভারতের করণীয়

ইসরায়েলে মোসাদের নাকের ডগায় যেভাবে গুপ্তচর তৎপরতা চালাচ্ছে ইরান

ইরান নিয়ে উভয়সংকট: ট্রাম্পের সিদ্ধান্তহীনতার পররাষ্ট্রনীতির নগ্ন উন্মোচন

ট্রাম্পের কৌশলেই বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনায় চীন

মিসরের সহায়তায় আফ্রিকাতেও যেভাবে মোসাদ ঠেকাচ্ছে চীন

৮ মাসে পাকিস্তানের এক প্রদেশেই পুলিশের হাতে নিহত ৯০০, কিন্তু কেন

ইরানে মোসাদের তৎপরতা যেভাবে ঠেকাচ্ছে চীন

এআই নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বাড়ছে, কিন্তু কেন

তিন দশক পর শক্তিশালী বিরোধী দল, আরও যেসব কারণে এবারের সংসদ হবে আলাদা