যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ঘিরে ২০২৫ সালজুড়ে যে অস্থিরতা ও টানাপোড়েন ছিল, তারপর এখন দুই দেশ বাস্তববাদী স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পর এমন আভাস আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশ অন্যান্য ভূরাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
গত সপ্তাহে তিন দিনের সফরে বেইজিং এসেছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ করপোরেট নির্বাহীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন—অ্যাপল, এনভিডিয়া, ব্ল্যাকরক, টেসলা-স্পেসএক্স এবং গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো বহুজাতিক কোম্পানির প্রধানেরা।
দুই নেতা এই বৈঠকের ঠিক ছয় মাসের কিছু বেশি সময় আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় এক বহুপক্ষীয় সম্মেলনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ এক বছরের জন্য স্থগিত রাখতে সম্মত হন। চীনের অর্থনৈতিক নীতির কড়া সমালোচক হলেও, এই সফরজুড়ে ব্যক্তিগতভাবে সির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক ছিল বেশ উষ্ণ। এমনকি তিনি প্রকাশ্যেই চীনা নেতার প্রশংসা করেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সিকে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনার সঙ্গে থাকতে পারা সম্মানের, আপনার বন্ধু হতে পারাও সম্মানের। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো হতে যাচ্ছে।’
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প-সির বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত বিবৃতিতে দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, দুই নেতা ‘আমেরিকান ব্যবসার জন্য চীনের বাজারে প্রবেশাধিকারের সম্প্রসারণ’ এবং ‘আমাদের শিল্প খাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির’ মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তবে লক্ষণীয় হলো—ওই বিবৃতিতে চীনের বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ ছিল না। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই উপকরণগুলোর বাজার প্রায় পুরোপুরি চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার সীমিত করতেও বেইজিং পদক্ষেপ নিয়েছে।
ক্রাইসিস অ্যানালাইসিস বা সংকট বিশ্লেষণী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলছে যে—তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে এমন খাতে ভাগ করে দেখতে চাইবেন, যেখানে ভূরাজনৈতিক বিরোধের চাপ ছাড়াই দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
অন্যদিকে তুলনামূলক সংযত ভাষায় কথা বললেও সি চিন পিংও ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ভিত্তিক নতুন যুক্তরাষ্ট্র-চীন কাঠামোর দিকে এগোনোর ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ইয়াংয়ের ভাষ্য, এর অর্থ হলো দুই দেশ যেন ‘প্রতিযোগিতা কমায়, মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং স্থিতিশীলতাকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হতে দিতে চায়।’
দুই নেতাই বেশ কিছু বিতর্কিত ইস্যু এড়িয়ে গেছেন বলেও মনে হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম তাইওয়ান প্রশ্ন। ২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের এই দ্বীপকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে বেইজিং। যদিও ওয়াশিংটন অনানুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়ে আসছে। বৈঠকে সি ট্রাম্পকে বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ এবং এটি ভুলভাবে সামলানো হলে দুই দেশের মধ্যে ‘সংঘর্ষ এমনকি সামরিক দ্বন্দ্ব’ও তৈরি হতে পারে। তাইওয়ানকে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করে আসছে বেইজিং। একই সঙ্গে তাইওয়ানের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটনকে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার চাপও দিচ্ছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র তাইপের সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও, চীনের ভূখণ্ড দাবির বিষয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরেই ইচ্ছাকৃত অস্পষ্ট নীতি বজায় রেখেছে। এত বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বিবৃতিতেই উল্লেখ করা হয়নি, ট্রাম্প তাইওয়ান প্রসঙ্গ বা ভবিষ্যৎ অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আলোচনা করেছেন কি না। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হয় তিনি সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন, নয়তো বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
ইয়াংয়ের মতো বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্প সির বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি আটকে দেবেন বা বিলম্ব করবেন কি না, তা এখনই বলা খুব চটজলদি হয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মতে, এই চুক্তি কার্যকর হতে ট্রাম্পের অনুমোদন প্রয়োজন।
ইরান ও হরমুজ প্রণালির বিষয়েও সি চিন পিং ছিলেন সতর্ক ও সংযত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর আগে ট্রাম্প চীনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তেহরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যবহার করে যেন তারা ইরানকে প্রণালিটি আবার খুলতে উৎসাহিত করে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালি দিয়ে যেত। ২০২১ সালে চীন ও ইরান ২৫ বছরের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ চুক্তি স্বাক্ষর করে। পাশাপাশি প্রতিবছর ইরানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ তেলও কিনে থাকে বেইজিং।
হোয়াইট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, বেইজিংয়ে বৈঠকের সময় ট্রাম্প আবারও বিষয়টি উত্থাপন করেন। বিবৃতিতে বলা হয়, দুই নেতা ‘একমত হয়েছেন যে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা জরুরি।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘প্রেসিডেন্ট সি স্পষ্ট করেছেন যে প্রণালিকে সামরিকীকরণের বিরোধিতা করে চীন এবং এর ব্যবহারের জন্য কোনো ধরনের টোল আরোপের চেষ্টারও বিরোধী তারা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে আরও বেশি আমেরিকান তেল কেনার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। উভয় দেশই একমত হয়েছে যে ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে পারে না।’
তবে বৃহস্পতিবারের বৈঠক নিয়ে চীনের প্রকাশিত বিবৃতিতে ইরান বা তার পারমাণবিক কর্মসূচির কোনো উল্লেখ ছিল না। বেইজিংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হাটং রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা অংশীদার চুচেং ফেং বলেন, এসব বিষয় বাদ যাওয়ার অর্থ হলো ইরানসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা ইস্যুতে সি ও ট্রাম্পের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। তবে সামগ্রিক বার্তা হচ্ছে, দুই পক্ষই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে চায়।
চুচেং ফেং বলেন, ‘বেইজিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্কের একটি ন্যূনতম ভিত্তি খুঁজে বের করা। এমন সুরক্ষা কাঠামো তৈরি ও শক্তিশালী করা, যাতে হঠাৎ কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি বা নিয়ন্ত্রণহীন উত্তেজনা তৈরি না হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আলাদা আলাদা মতবিরোধ তুলনামূলকভাবে গৌণ।’