ইরানে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর গভীর অনুপ্রবেশের বিষয়টি নাটকীয়ভাবে সামনে আসে গত বছরের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধে। তবে ইরানও বসে ছিল না। তারাও ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে নিজস্ব আগ্রাসী নিয়োগ ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযান চালাচ্ছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি গুপ্তচর তৎপরতার পরিসর, বিস্তার ও সাফল্য এক নয়। তবু পরিস্থিতি এতটা উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যে যুদ্ধ শেষে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা দেশের জাতীয় জনকূটনীতি অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে একটি গণমাধ্যম প্রচারাভিযান শুরু করে। সেখানে ইসরায়েলিদের ইরানের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি না করার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।
যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা কার্যত ইরানকে নিজেদের পেছনের উঠান হিসেবে ব্যবহার করে। তারা ইরানি নাগরিক এবং প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের নিয়োগ দেয় গুপ্তচর হিসেবে। নিজেদের এজেন্ট ঢুকিয়ে দেয় ইরানের সবচেয়ে গোপন পারমাণবিক স্থাপনা, বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে। এই তৎপরতার গোপন অভিযান সম্ভব হয়। এর মধ্যে ছিল ইরানের মধ্যাঞ্চলে দূরনিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করা।
গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেতর থেকেই ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়। ইসরায়েলের হয়ে কাজ করা কিছু ইরানি ‘প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তিত যানবাহন’ দেশটিতে পাচার করতেও সহায়তা করে। এগুলো ব্যবহার করা হয় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাতে এবং ইসরায়েলি বিমানকে ইরানের আকাশসীমায় ঢোকার পথ পরিষ্কার করতে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরের কয়েক সপ্তাহে ইরানি কর্মকর্তারা দেশে ব্যাপক ধরপাকড় চালান। ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে—এমন সন্দেহে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইরান তাদের এক পারমাণবিক বিজ্ঞানীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়। অভিযোগ, তিনি ইসরায়েলের হয়ে কাজ করেছেন। এখন ইরান পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দিতে চায়। তারা ইসরায়েলের ভেতরে নিজেদের হয়ে কাজ করবে—এমন লোকের নেটওয়ার্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এখন পরিষ্কার, যখন ইসরায়েল ইরানে সোর্স ও এজেন্ট নিয়োগ করছিল, তখন ইরানও একই কাজ করছিল ইসরায়েলে। তবে তার প্রভাব ছিল অনেক ছোট পরিসরে। ইসরায়েলে অনুপ্রবেশ ও নজরদারির চেষ্টা ইরান অন্তত ২০১৩ সাল থেকে করে আসছে। কিন্তু ২০২০ সালের শুরু থেকে ইসরায়েলি ও অ-ইসরায়েলি নাগরিকদের ইরানের হয়ে কাজ করতে নিয়োগের প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, এমন তথ্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নথিভুক্ত করেছে।
ইসরায়েল যেমন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা ও পারমাণবিক সংস্থায় গভীরভাবে ঢুকে পড়েছিল, ইরানের তৎপরতা তেমন নয়। তারা মূলত প্রান্তিক জায়গায় চাপ সৃষ্টি করেছে। ইসরায়েলি সমাজ ও গোয়েন্দা কাঠামোয় ঢোকার চেষ্টা করেছে ধীরে ধীরে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর লক্ষ্য করা হয়েছে আর্থিক সংকটে থাকা ইসরায়েলিদের।
শুরুর দিকে ইরান তাদের নিয়োগপ্রাপ্তদের দিয়ে সাধারণ তথ্য সংগ্রহ করাত; যেমন—ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান, নেতাদের অবস্থান। এ ছাড়া জনসমক্ষে সরকারবিরোধী পোস্টার ও দেয়াললিখন করতে বলা হতো, যাতে ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়। ১২ দিনের যুদ্ধের আগের দিনগুলোতে ইরানি কর্মকর্তারা দাবি করেন, ইসরায়েলের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সংবেদনশীল নথি তাদের গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সংগ্রহ করেছে। ইরানের তৎকালীন গোয়েন্দামন্ত্রী খতিব বলেন, ‘সম্পূর্ণ পারমাণবিক ফাইল সংগ্রহ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক-সংক্রান্ত নথিও পাওয়া গেছে। এমন গোয়েন্দা তথ্যও মিলেছে. যা ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা জোরদার করবে।’
কিন্তু ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এপ্রিল মাসে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা এবং অক্টোবরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাঝামাঝি সময়ে ইরান তাদের নিয়োগপ্রাপ্তদের শুধু গুপ্তচরবৃত্তি নয়, অগ্নিসংযোগ ও এমনকি হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনার দায়িত্বও দিতে শুরু করে। লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, নিরাপত্তা ও সামরিক নেতা এবং জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকেরা। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনার সংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দেন। ইসরায়েলি পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট মাওর গোরেন বলেন, ‘গত কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশক দেখলেও, এমন ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া লোকের সংখ্যা আমরা দুই হাতে গুনতে পারি।’
যদিও কোনো হত্যাচেষ্টা সফল হয়নি। তারপরও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানায়, কয়েকটি ঘটনা বাস্তবায়নের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। শেষ মুহূর্তে সেগুলো ঠেকানো হয়। সাধারণ গুপ্তচরবৃত্তির মামলা গড়ে উঠতে সময় লাগে। কিন্তু কিছু হত্যার পরিকল্পনা প্রথম যোগাযোগের মাত্র ৯ দিনের মধ্যেই তৈরি হচ্ছিল। আবার কিছু ক্ষেত্রে, আজারি বংশোদ্ভূত কয়েকজনের একটি দল প্রায় দুই বছর ধরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি চালালেও তা ধরা পড়ে পরে। তারা যখন সামরিক স্থাপনা পর্যবেক্ষণ থেকে সরে এসে এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন তাদের শনাক্ত করা হয়।
মার্কিন ইসরায়েলঘেঁষা থিংকট্যাংক দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ‘ইরানিয়ান এক্সটারনাল অপারেশনস ম্যাপ’ (যা ইরানের বিদেশি ষড়যন্ত্রগুলো নির্দেশ করে) অনুসরণ করে। সেখানে দেখা যায়, ইসরায়েলে ইরানের হয়ে কাজ করা ইসরায়েলিদের মাধ্যমে অন্তত ৩১টি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব ব্যক্তি দেয়াললিখন করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে। পাশাপাশি সামরিক ঘাঁটি, সরকারি কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করে ইরানে তাদের হ্যান্ডলারদের কাছে পাঠিয়েছে। তবে এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইসরায়েলে একটি সফল হত্যাকাণ্ড বা লক্ষ্যভিত্তিক হামলাও ঘটাতে পারেনি ইরান।
ইরান মূলত অনলাইনে নিয়োগ কার্যক্রম চালায়। টেলিগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে থাকা অবস্থায় সরাসরি যোগাযোগের ঘটনাও আছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ প্রণোদনা বড় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সমাজের ভেতরের বিদ্যমান বিভাজনও কাজে লাগানো হয়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের নথিভুক্ত ৩১টি ঘটনার মধ্যে ২০ টিতেই অর্থ লেনদেন ছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অর্থ দেওয়া হয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে।
এই ৩১টি ঘটনার মধ্যে ২৫ টিতে অভিযুক্ত ইসরায়েলিরা জানত, বা অন্তত সন্দেহ করত যে, তারা ইরানিদের হয়ে কাজ করছে। তবু তাদের অনেকেই নিজেদের কাজকে পূর্ণাঙ্গ গুপ্তচরবৃত্তি মনে করেনি। তারা ভেবেছিল, বিষয়টি তার চেয়ে হালকা। যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাদের কাজের ধরনও ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ শুধু দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকত বা পোস্টার লাগাত। আবার কেউ ছিল একেবারে অপেশাদার। কাজের দক্ষতাও কম ছিল। তবে সবাই যে অদক্ষ ছিল, তা নয়। কয়েকজন আরও গুরুতর কাজে জড়ায়। তারা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করত। অন্যদের দলে টানার চেষ্টা করত। কখনো কখনো নিজেদের পরিবারের সদস্যদেরও টার্গেট করত নেটওয়ার্ক বড় করার জন্য।
এর একটি উদাহরণ বাসেম ও তাহরির সাফাদি। সম্পর্কে বাবা-ছেলে। সিরিয়ার সীমান্তঘেঁষা দ্রুজ গ্রাম মাসাদের বাসিন্দা। তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কুদস ফোর্সের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে। বাবার অনুরোধে তাহরির গোলান হাইটসে আইডিএফের চলাচল-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করত। পরে তা পাঠাত হুসাম আস-সালাম তাওফিক জিদান নামের এক ব্যক্তিকে। তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম আল-আলাম নিউজ নেটওয়ার্কের সাংবাদিক। জিদান দামেস্কে থাকতেন। তিনি কুদস ফোর্সের ফিলিস্তিন বিভাগে কাজ করতেন। অভিযোগ, তিনি বাসেম ও তাহরিরকে সেনা, ট্যাংকের চলাচল, সরঞ্জামসহ বিভিন্ন কিছুর ছবি তুলতে বলেছিলেন।
সবচেয়ে গুরুতর ষড়যন্ত্রগুলোর একটি ছিল—২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত এবং সাবেক শিন বেত পরিচালক রোনেন বারকে হত্যার পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করে ইসরায়েল। মোতি মামান নামে এক ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁর তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। অভিযোগ, তিনি দুবার তুরস্ক ও ইরান সফর করেছেন। সেখানে ইরানি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন। লক্ষ্য ছিল নেতানিয়াহু, গ্যালান্ত ও বারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এগিয়ে নেওয়া।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ইরানের হয়ে কাজ করা কিন্তু কাজ শেষ করতে ব্যর্থ ইসরায়েলি নাগরিকদের ভয় দেখাতে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিদের হত্যার জন্য রুশ বা আমেরিকান কাউকে খুঁজে বের করার কথাও বলা হয় তাঁকে। এমনকি মোসাদের এক কর্মকর্তাকে ডাবল এজেন্ট হিসেবে দলে টানার চেষ্টার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ইরান ছাড়ার আগে মামান ইরানি গোয়েন্দাদের কাছ থেকে ৫ হাজার ইউরো পান। শিন বেতের তথ্য অনুযায়ী, হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এই হত্যাচেষ্টার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ২০১৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েলে ইরানের ৩৯টি গুপ্তচর অভিযানের তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে ৩১ টিতে ইসরায়েলি নাগরিক জড়িত ছিল। বাকি ঘটনাগুলোতে ফিলিস্তিনি বা অন্য অ-ইসরায়েলি নাগরিক জড়িত ছিল। কয়েকটি ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি ছিল। ফলে ৩১টি ঘটনায় ইসরায়েলি অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৫ জনের বেশি।
ইসরায়েলের ন্যাশনাল পাবলিক ডিপ্লোমেসি ডাইরেক্টরেটের তথ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় জড়িত ৩৫ ইসরায়েলি নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বয়স ১৩ থেকে ৭৩ বছরের মধ্যে। অর্ধেকের বেশি কিশোর বা বিশের কোঠায়। নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের পটভূমি ছিল বিভিন্ন রকম। কেউ আজারবাইজানি, কেউ ককেশাস অঞ্চলের। তাদের গুপ্তচরবৃত্তির লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং সামাজিক দুর্বলতা। এর মধ্যে ছিল আয়রন ডোম, সরকারি কর্মকর্তা, মাহানে ইয়েহুদা বাজার, আইডিএফ ঘাঁটি, পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও স্থাপনা, শপিং মল ও হাসপাতাল। লক্ষ্যবস্তুর এই বিস্তৃতি দেখায়, আর্থিক, আদর্শিক ও ব্যক্তিগত প্রলোভন ব্যবহার করে ইসরায়েলের ভেতরে প্রভাব গড়তে চেয়েছিল ইরানি গোয়েন্দারা।
ইরানের গোয়েন্দামন্ত্রী ইসমাইল খতিব ইসরায়েলে গুপ্তচরবৃত্তি ও নাশকতাকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বৃহত্তর যুদ্ধের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। ১২ দিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক মাস পর তিনি বলেন, ‘জায়নিস্ট শাসনব্যবস্থাকে নিজেদের ভেতরে অভ্যন্তরীণ আগ্রাসনের কৌশলের মুখোমুখি হতে হবে। যেমন আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র তাদের যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করেছে, তেমনি আমাদের সব গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাও কাজ করছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আপনারা দেখেছেন, জায়নিস্ট শাসনের ভেতরে গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তারা ব্রিফিং করতে বাধ্য হয়েছে।’
ইসরায়েলে ইরানের নিয়োগ প্রচেষ্টার জবাবে শিন বেত ও ন্যাশনাল পাবলিক ডিপ্লোমেসি ডাইরেক্টরেট যৌথভাবে একটি দেশব্যাপী জনসচেতনতা প্রচার শুরু করে। প্রচারের নাম ‘ইজি মানি, হেভি প্রাইস।’ রেডিও, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রচার চালানো হয়। সেখানে সতর্ক করা হয়, ইরান থেকে সামান্য অর্থ, প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার নিলেও গুরুতর পরিণতি হতে পারে। বিজ্ঞাপনে বলা হয়, যারা টাকা নিয়েছে তাদের কেউ কেউ এখন কারাগারে। তেহরানকে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে এসব গুপ্তচর অভিযানের প্রেক্ষাপটে দেখা জরুরি। এগুলোর কোনোটিই হিজবুল্লাহ বা ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানের মতো জটিল, কৌশলগত বা দক্ষ ছিল না। ইসরায়েল সম্ভাব্য এজেন্টদের ধীরে যাচাই করে, প্রশিক্ষণ দেয়। কিন্তু ইরান অনলাইনে এলোমেলোভাবে নিয়োগ দেয়। খুব কম নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি তুরস্কে গিয়ে হ্যান্ডলারের সঙ্গে দেখা করে বা ইরানে প্রশিক্ষণ নেয়। দুই পক্ষের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও দক্ষতার স্তর সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তবু ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তারা মনে করে, দীর্ঘমেয়াদে ইরান বড় হুমকি হতে পারে। আইআরজিসির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ খাদেমি মাস কয়েক আগে বলেছেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমরা সাময়িক বিরতিতে আছি।’ খতিবও স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েলের ভেতরে ‘আক্রমণাত্মক অভ্যন্তরীণ কৌশল’ নিতে হবে, যাতে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো নিজেদের ভূখণ্ডে ইরানি এজেন্টদের ‘অভ্যন্তরীণ আগ্রাসনের কৌশলের’ মুখোমুখি হয়।
ইসরায়েল যেমন ইরানের ভেতরে প্রবেশের সক্ষমতা দেখিয়েছে, তেমনি এখন দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো মনে করছে, ইসরায়েলের ভেতরে ইরানি গুপ্তচরবৃত্তি ঠেকাতে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে। জনসচেতনতা প্রচার সম্ভবত বড় ধরনের পাল্টা গুপ্তচরবৃত্তি অভিযানের শুরু মাত্র। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক বছরে তারা যে চিত্র দেখেছেন, তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বড় গুপ্তচর হুমকি।
দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউশন থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান