হোম > বিশ্লেষণ

সৌদি-আমিরাত মৈত্রীর অবসান, ইয়েমেন কি ভাঙছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের দীর্ঘদিনের মৈত্রী ভেস্তে যাওয়ার পথে। ছবি: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা ইয়েমেন থেকে তাদের অবশিষ্ট সৈন্য সরিয়ে নেবে। ইয়েমেনি প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিল থেকে তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার যে চরমপত্র দেওয়া হয়েছিল, তাতে খোদ সৌদি আরব সমর্থন জানানোর পর আমিরাত এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিল।

এই নাটকীয় পরিস্থিতির সূত্রপাত দক্ষিণ ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মুকাল্লায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের এক অতর্কিত বিমান হামলাকে কেন্দ্র করে। সৌদি আরবের দাবি, আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য সেখানে এক বিশাল অস্ত্রের চালান এসেছিল। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বলেছে, ওই জাহাজে কোনো অস্ত্র ছিল না। সৌদির এই অপবাদে তারা ‘গভীর অনুতাপ’ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

এক দশক ধরে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের দমনে সৌদি আরব ও আমিরাত কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সমর্থিত স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে স্বার্থের লড়াই শুরু হয়। সাবেক এই মিত্রদের মধ্যকার সেই চোরা স্রোত এখন এক গভীর খাদের সৃষ্টি করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারায় নিয়ে ঠেকিয়েছে।

রিয়াদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তারা বলছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর ‘চাপ সৃষ্টি’ করছে, যাতে তারা পূর্ব দিকের দুটি প্রদেশে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। সৌদি আরব একে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় তারা যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

মঙ্গলবার বিকেলে আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, তারা ইয়েমেনে অবস্থানরত তাদের অবশিষ্ট সন্ত্রাসবিরোধী কর্মীদের ‘নিজ ইচ্ছায়’ সরিয়ে নিচ্ছে। উল্লেখ্য, এর ছয় বছর আগেই আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনী ইয়েমেনে তাদের মূল অভিযান ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করেছিল। এবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এবং সন্ত্রাসবিরোধী মিশনের নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার কথা মাথায় রেখেই এই প্রত্যাহার। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ বিবৃতিতে সৌদি জোটের সেই বিমান হামলা বা রিয়াদের সরাসরি হুমকির বিষয়ে একটি শব্দও খরচ করা হয়নি।

অন্যদিকে মঙ্গলবার সকালে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আসা বিবৃতিটি ছিল রীতিমতো অগ্নিগর্ভ। তারা জানিয়েছে, সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল বা এসটিসি সম্প্রতি যে উসকানিমূলক পথে হাঁটছে, তা ‘নিয়ন্ত্রণে’ আনতে রিয়াদ সর্বাত্মক কাজ করছে। এই এসটিসি মূলত উত্তর ইয়েমেন থেকে আলাদা হয়ে দক্ষিণ ইয়েমেনের স্বাধীনতা চায়। সৌদি আরবের দাবি, আমিরাত এই এসটিসিকে প্ররোচিত করে হাজরামাউত ও আল-মাহরা প্রদেশে সামরিক অভিযান চালাতে বাধ্য করছে। রিয়াদের মতে, এটি কেবল ইয়েমেনের স্থিতিশীলতা নয়, বরং খোদ সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্যও এক বিশাল হুমকি।

আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য পাল্টা বিবৃতিতে এসব অভিযোগ ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে। তারা সাফ জানিয়েছে, সৌদি আরবের সীমান্ত বা নিরাপত্তায় আঘাত হানে—এমন কোনো সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য তারা কোনো ইয়েমেনি পক্ষকে কোনো নির্দেশ বা চাপ দেয়নি। তাদের দাবি, এসটিসির অভিযানের শুরু থেকেই তারা পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং বিবাদ মেটাতে নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছে।

এদিকে ইয়েমেনের আট সদস্যের প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রধান রশাদ আল-আলিমি এক অভাবনীয় ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর এই পরিষদে এসটিসির প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। আলিমি আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি একতরফাভাবে বাতিল করে দেন এবং তাদের বাহিনীকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইয়েমেন ত্যাগের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব এবং স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া অনিবার্য ছিল।’

একই সঙ্গে আল-আলিমি দেশে ৯০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তাঁর সাফ কথা, হুতিদের মোকাবিলা করার পাশাপাশি আমিরাতের নির্দেশে চলা কিছু ‘বিদ্রোহী সামরিক উপাদানের’ সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা দমন করা এখন সময়ের দাবি। তবে এসটিসি নেতারা এই আলটিমেটাম মেনে নিতে নারাজ। তারা বলছেন, এই নির্দেশের কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং যুদ্ধের ময়দানে আমিরাত সব সময় তাদের এক অংশীদার হয়ে থাকবে।

মুকাল্লা বন্দরের বিমান হামলা নিয়ে সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানান, আমিরাত থেকে আসা দুটি জাহাজে করে যে অস্ত্র ও সামরিক যান বন্দরে নামানো হচ্ছিল, তা ছিল শান্তির পথে এক বিরাট অন্তরায়। সেই ‘আসন্ন বিপদ’ রুখতেই তারা এই সীমিত বিমান হামলা চালিয়েছেন।

মুকাল্লা বন্দরের এক কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় ভোর ৪টার দিকে তাদের কাছে এলাকা খালি করার সতর্কবার্তা আসে। তার ঠিক ১৫ মিনিট পরেই বন্দরের একটি খোলা জায়গায় বোমা পড়ে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, বন্দরের দেয়ালঘেরা এলাকায় সারি সারি সামরিক জিপ ও পিকআপ ভ্যান পুড়ে কয়লা হয়ে পড়ে আছে। তবে কোনো মানুষ মারা যায়নি।

এই ঘটনায় আমিরাত যারপরনাই অবাক হয়েছে। তারা জানিয়েছে, জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে কোনো আলাপ না করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, ওই জাহাজে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং গাড়িগুলো স্থানীয় কাউকে দেওয়ার জন্য নয়, বরং আমিরাতি বাহিনীর নিজেদের ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল।

২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে যে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলছে, তা দেশটিকে এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। হুতিরা যখন রাজধানী সানা দখল করে বৈধ সরকারকে উৎখাত করে, তখন থেকেই এই নরকের সূচনা। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এই যুদ্ধে অংশ নিলে তা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। গত এক দশকে দেড় লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং তৈরি হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম নিকৃষ্টতম মানবিক সংকট।

যুদ্ধের সেই আদিলগ্নে এসটিসি এবং অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হুতিদের ঠেকাতে সরকারের সঙ্গে এক জোট হয়েছিল। ১৯৯০ সালের আগে দক্ষিণ ইয়েমেন যখন আলাদা দেশ ছিল, সেই পুরোনো স্বাধীন সত্তাকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে সব সময়ই ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই সখ্য তিতা হয়ে গেছে। এসটিসি এখন খোদ সরকারের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করে এডেনসহ দক্ষিণের বিস্তীর্ণ জনপদ নিজেদের কবজায় নিয়েছে।

বিবিসি থেকে অনূদিত

ঢাকায় মোলাকাত: শুধুই সৌজন্য নাকি ভারত–পাকিস্তান সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের সূত্রপাত

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—নতুন বছরে চতুর্মুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ভারত

বাংলাদেশ-নেপালের নির্বাচন, মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎসহ নতুন বছরে দ. এশিয়ায় আলোচনায় থাকবে যে ৫ বিষয়

আল জাজিরার বিশ্লেষণ: খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকার কি তাঁর ছেলে এগিয়ে নিতে পারবেন?

২০২৫ সালে ট্রাম্প কয়টি দেশে বোমা হামলা চালিয়েছেন?

কোন স্বার্থে মুসলিমপ্রধান সোমালিল্যান্ডকে সবার আগে স্বীকৃতি দিল ইসরায়েল

নাইজেরিয়ায় কোন আইএসকে আঘাত করল মার্কিন বাহিনী

নাইজেরিয়ায় কেন হামলা চালাল মার্কিন বাহিনী, খ্রিষ্টান নিপীড়নের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী

‘ভেনেজুয়েলা সংকট’ কীভাবে আন্তর্জাতিক সংঘাতের রূপ নিচ্ছে

ভেনেজুয়েলার তেল আমাদের সম্পদ—ট্রাম্প প্রশাসনের এই দাবি কি যৌক্তিক