দ্য এক্সিওসের বিশ্লেষণ
গ্রিনল্যান্ড ও শুল্ক ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ ও জবরদস্তিমূলক অবস্থান নিয়ে স্পষ্টতই বিরক্ত ইউরোপীয় নেতারা। সর্বশেষ, গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে ইউরোপের দেশগুলোর ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের হুমকির পর ইউরোপীয় নেতারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিচ্ছেদের পথে হাঁটাই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। বিষয়টি নিয়েই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সিওস। আজকের পত্রিকার পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন আব্দুর রহমান।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব ব্যবস্থার অবসান ঘোষণা করল আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। গতকাল মঙ্গলবার তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরন্তর চাপ ও জবরদস্তি ওই ব্যবস্থার মারাত্মক দুর্বলতা প্রকাশ করে দিয়েছে। ট্রাম্পকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের সাবধানী আচরণের দিন শেষ। দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই—গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটে যার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে—এমন আশঙ্কা আরও স্পষ্ট হয়েছে যে পুরোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থা আর রক্ষা করা সম্ভব নয়।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে শুল্ক আরোপের হুমকি প্রসঙ্গে বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ভেভার বলেন, ‘খুশি খুশি অধীনত (দেশ) হওয়া এক বিষয়। কিন্তু দুঃখী দাস হওয়া আরেক বিষয়। এখন যদি আপনি পিছু হটেন, তাহলে আপনার মর্যাদা হারাবেন।’
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বা বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মঞ্চজুড়ে এমনই কঠোর ভাষার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে। আজ বুধবার ট্রাম্প সেখানে পৌঁছাবেন। এটি এমন এক সম্মেলনে যা ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক উত্তেজনা ও বাজারের উদ্বেগে আচ্ছন্ন।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়ন মিত্রদের প্রতি ট্রাম্পের বৈরী মনোভাবকে ১৯৭১ সালের ‘নিক্সন শকে’র সঙ্গে তুলনা করেন। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র স্বর্ণমান ত্যাগ করে যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে উল্টে দিয়েছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপকে ‘স্থায়ী’ভাবে মুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে—এই আশায় বসে থাকলে ইউরোপের দুর্বলতাই বাড়বে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ট্রাম্পের ‘শুল্কের অন্তহীন নির্বিচার প্রয়োগ’কে ‘মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন। বিশেষ করে, যখন তা ‘ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপ হিসেবে’ ব্যবহার করা হয়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সবচেয়ে স্পষ্ট ভাষায় মত দেন। দাভোসে তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘স্পষ্ট করে বলছি—আমরা কোনো রূপান্তরের মধ্যে নেই, আমরা একটি বিচ্ছেদের মধ্যে আছি।’
কার্নি বলেন, ‘আমরা জানতাম যে, আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার গল্পটি আংশিকভাবে মিথ্যা ছিল। শক্তিশালীরা সুবিধা হলে নিজেদের ছাড় দিত। বাণিজ্যনিয়ম অসমভাবে প্রয়োগ হতো। আন্তর্জাতিক আইন অভিযুক্ত বা ভুক্তভোগীর পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন কঠোরতায় প্রয়োগ করা হতো।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই কল্পকাহিনি এতদিন কার্যকর ছিল।’ কারণ, মার্কিন আধিপত্য বৈশ্বিক জনকল্যাণ নিশ্চিত করেছিল—উন্মুক্ত সমুদ্রপথ থেকে শুরু করে স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা পর্যন্ত। কিন্তু ‘এই সমঝোতা আর কাজ করছে না।’ তিনি সতর্ক করেন, এখন ‘পরাশক্তিগুলো’ সেই অর্থনৈতিক সংযুক্তিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, যা এত দিন বিশ্বায়নের ভিত্তি ছিল।
এক কানাডীয় কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে জানান, কার্নি ইচ্ছাকৃতভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ট্রাম্পের নাম নেননি। তবে তাঁর বক্তব্য সরাসরি প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডকেই লক্ষ্য করে ছিল। সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকার কার্নির ভাষণ শেষ হলে দাভোসের শ্রোতারা দাঁড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
ইউরোপের বহু নেতার ঘনিষ্ঠ এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চাপ ‘এই প্রথম ইউরোপীয়দের জন্য চূড়ান্ত সীমা অতিক্রম করেছে’ এবং অনেকেই মনে করছেন, প্রতিরোধ গড়ে তোলার এটাই তাদের শেষ সুযোগ হতে পারে।
ট্রাম্পের হুমকির বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ১০৯ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের পাল্টা শুল্ক আরোপের প্যাকেজ বিবেচনা করছে। মাখোঁ বলেন, ইইউ–এর উচিত তার ‘অ্যান্টি-কোয়ারশন ইন্সট্রুমেন্ট বা ট্রেড বাজুকা’—চীনের অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার জন্য তৈরি শক্তিশালী বাণিজ্যিক অস্ত্র—ব্যবহারে ‘দ্বিধা না করা।’ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এটি প্রয়োগ প্রসঙ্গে ম্যাক্রোঁ বলেন, ‘এটা পাগলামি। আমি সত্যিই দুঃখিত। কিন্তু এটা অনিশ্চয়তা আর অপ্রয়োজনীয় আগ্রাসনের ফল।’
এই বিচ্ছেদ কেবল গ্রিনল্যান্ড বা বাণিজ্য ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়। হাঙ্গেরিই একমাত্র ইউরোপীয় দেশ হিসেবে ট্রাম্পের সদ্য ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিসে’ যোগ দিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, পারস্পরিক আস্থা কতটা ক্ষয় হয়েছে এবং তার উদ্যোগগুলোকে বৈধতা দিতে মিত্ররা কতটা অনিচ্ছুক। এ পর্যন্ত এই বোর্ডে সমর্থন এসেছে আলবেনিয়া, বেলারুশ, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মরক্কোর নেতাদের কাছ থেকে।
ট্রাম্প মঙ্গলবার সকালে ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ও অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা সেই বৈঠকে থাকবেন না। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী দাভোসে যেতেই রাজি হননি। আর মাখোঁ গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই সুইজারল্যান্ড ছাড়েন।
জার্মানি বা যুক্তরাজ্যের নেতারা রুটের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেবেন কি না—তা স্পষ্ট নয়। এই বৈঠক এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইউরোপ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে এবং দ্বীপটির প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সম্ভাব্য আগ্রাসনের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।
এদিকে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দাভোসের ‘ইউএসএ হাউসে’ ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা কিরিল দিমিত্রিয়েভের সঙ্গে ইউক্রেন শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠক করেন। দাভোসে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া শান্তির দিকে এগোনোর কোনো প্রকৃত আগ্রহ দেখায়নি। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন না। রাশিয়ার এক ভয়াবহ হামলার পর শীতের মধ্যে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় পানি ও বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী ডে ভেভার বলেন, ‘এখন আর নরম হওয়ার কোনো মানে নেই। কেউ যদি বলে, আমি তোমার ন্যাটো ভূখণ্ড নেব, না হলে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করব। তাহলে আমরাও বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করব।’