মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ‘জয়ী’ ঘোষণা করছেন, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। এই দ্বিমুখী তৎপরতা ইরান যুদ্ধে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে। সম্প্রতি ওই অঞ্চলে কয়েক হাজার মার্কিন মেরিন এবং উভচর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। এই প্রবণতা একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি তবে ইরানের ‘অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি’ খ্যাত খারগ দ্বীপ দখল করতে যাচ্ছে?
খারগ দ্বীপ মূলত পারস্য উপসাগরে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। আয়তনে নিউইয়র্কের ম্যানহাটন শহরের এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে এটি ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান, কারণ দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই দ্বীপের টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশে রপ্তানি হয়। ফলে এই দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অর্থ হলো ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। তবে সামরিক বিশ্লেষকেরা প্রশ্ন তুলছেন, ওয়াশিংটন যদি সফলভাবে এই দ্বীপ দখলও করে, তবুও ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে বাধ্য করতে পারবে কি যুক্তরাষ্ট্র?
খারগ দ্বীপের জেটিগুলো এমন গভীর জলে অবস্থিত যেখানে বিশালাকার তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কারগুলো সহজেই নোঙর করতে পারে। ১৯৮৪ সালের সিআইএয়ের প্রকাশিত একটি গোপন নথিতেও এই দ্বীপকে ইরানের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি বলে অভিহিত করা হয়েছিল। যদিও ইরান হরমুজ প্রণালীকে এড়িয়ে ওমান উপসাগরের জাস্ক টার্মিনাল দিয়ে বিকল্প রপ্তানি রুট তৈরির চেষ্টা করেছে, তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মতে, সেটি খুব একটা কার্যকর নয়।
প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল ধারণক্ষমতার এই দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল খনিজ তেল মজুত রয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইসরায়েলের বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ায়ের লাপিদ প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে এবং বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে খারগ দ্বীপের তেল ক্ষেত্র ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করা অপরিহার্য।
স্থল অভিযানের ঝুঁকি
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ‘মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ (এমইইউ) মোতায়েন করা হয়েছে, যারা দ্রুত জলে ও স্থলে অবতরণ এবং কমান্ডো অভিযানে বিশেষভাবে পারদর্শী। ন্যাটোর সাবেক সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার জেমস স্টাভরিডিস সতর্ক করে বলেছেন, খারগ দ্বীপে যেকোনো স্থল অভিযানের আগে মার্কিন জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালী পাড়ি দিতে হবে। সেখানে তাদের ইরানের ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং সমুদ্রের তলদেশে পেতে রাখা মাইন হামলার মুখে পড়তে হবে।
স্টাভরিডিস আরও জানান, খারগদ্বীপের দখল নেওয়ার পর মার্কিন নৌ সেনাদের ওই দ্বীপের চারপাশের অন্তত ১০০ মাইল এলাকায় নিরঙ্কুশ আকাশ ও নৌ-আধিপত্য বজায় রাখতে হবে। এই অভিযানে বড় ঝুঁকি হলো উভচরী মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর ওপর ইরান সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করবে এবং দ্বীপের হাজার হাজার বেসামরিক তেল শ্রমিকদের সরিয়ে নেওয়ার মানবিক সংকট। এ ছাড়া মার্কিন থিংক ট্যাংক ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড হাস সতর্ক করে বলেছেন, এই ধরণের অভিযানে বিপুল মার্কিন সেনা হতাহতের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের মূল্যবান ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যাবে এবং বিশ্ববাসী একে ইরানের তেলসম্পদ চুরির মার্কিন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার মধ্যে ইরান বসে নেই। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, তেহরান খারগদ্বীপে অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে কাঁধে রেখে উৎক্ষেপণযোগ্য ‘ম্যানপ্যাড’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। একই সাথে দ্বীপের উপকূলে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ট্যাঙ্ক ও মানব-বিধ্বংসী ল্যান্ডমাইন বিছিয়ে রাখা হয়েছে।
গত বুধবার ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, শত্রুরা যদি একটি দ্বীপও দখল করার চেষ্টা করে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সেই মদদদাতা দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ইরান অবিরাম ও বিধ্বংসী হামলা চালাবে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের নৌপ্রধান আলী রেজা তাংসিরিও পারস্য উপসাগরের দ্বীপগুলোকে ‘দুর্গ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, শত্রু পক্ষ একটি ভুল পদক্ষেপ নিলে চরম মূল্য দিতে হবে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো তথা যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা গোপনে ট্রাম্প প্রশাসনকে খারগ দ্বীপে স্থলসেনা না নামাতে অনুরোধ করছে। তাদের শঙ্কা হলো, দ্বীপে মার্কিন হামলা শুরু হলে ইরান প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর তেল ও জ্বালানি অবকাঠামোতে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
পিছুপা হবেন না ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার তিন দশক আগে ১৯৮৮ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজে একটি গুলি লাগলে তিনি খারগ দ্বীপ দখল করে নেবেন। চলতি মাসের শুরুতে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র খারগ দ্বীপের ‘সমস্ত সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ ইতিমধ্যে ধ্বংস করেছে।
হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের একাংশ বিশ্বাস করেন, খারগ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিলে আইআরজিসি দেউলিয়া হয়ে যাবে এবং যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে। তবে প্রশাসনের ভেতরে অনেকেই এত বড় স্থল অভিযানের ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন।
তীব্র উত্তেজনা, তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং সামরিক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কার মাঝে খারগ দ্বীপকে ঘিরে ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।
সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ