ওয়াশিংটন গত রোববার ইঙ্গিত দিয়েছে, ইরানে তারা যে সংঘাত শুরু করেছে, তা চার-পাঁচ সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে গণমাধ্যমে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। চীনা সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের ওপর হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলক বড় পরিসরে প্রস্তুতি নিলেও সীমিত গোলাবারুদের ভান্ডার এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা হ্রাস দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের ওপর তাদের হামলা ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ পর্যন্ত চালিয়ে যাবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, লড়াইয়ের তীব্রতা বজায় রাখা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘কঠিন হবে না।’ যদিও একই সঙ্গে তিনি আরও মার্কিন হতাহতের সম্ভাবনার কথাও সতর্ক করে উল্লেখ করেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগনের উদ্বেগের কথা ট্রাম্প উল্লেখ করেননি। সমর কৌশলবিদদের মতে, এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের এমন মজুত আরও কমিয়ে দিতে পারে, যা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরুর আগেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল।
মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান বা সেনাপ্রধান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ছোট বা মাঝারি মাত্রার হামলা চালানোর জন্য সেনা সমাবেশ করেছে। তবে এতে মার্কিন হতাহতের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। একই সঙ্গে এমন অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রোববার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, এখন বিষয়টি বাস্তব পরীক্ষার মুখে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত অভিযান চালাচ্ছে। কারণ, তেহরানের পাল্টা হামলা ঠেকাতে ব্যবহৃত প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা এবং বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেলি গ্রিয়াকো বলেন, ‘চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো, এগুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে যেতে পারে। আমরা যেভাবে ব্যবহার করছি, সেই গতিতে এগুলো প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
ইসরায়েলও তাদের গোলাবারুদের সরবরাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন। এক মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানান, ইসরায়েলের অ্যারো-৩ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর এখনো কম রয়েছে। এর আগেও বিদেশি কিছু গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সময় একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দেয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো ২০২৫ সালের জুলাই মাসে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পেন্টাগন ইউক্রেনে কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য নির্ভুল অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পেন্টাগনের নীতিপ্রধান এলব্রিজ কোলবির উদ্যোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পেন্টাগনের গোলাবারুদের মজুত পর্যালোচনার পর দেখা যায়, আর্টিলারি শেল, আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও নির্ভুল অস্ত্রের মোট সংখ্যা কমে যাচ্ছে—এমন উদ্বেগ থেকেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চীনা সামরিক বিশ্লেষক ঝাং জুনশে সোমবার দেশটির রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বর্তমান উচ্চমাত্রার বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে, তাহলে তা খুব দীর্ঘ সময় ধরে বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। এরপর হামলার তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তিনি আরও বলেন, শিল্প খাত সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতাও কমেছে। ফলে দ্রুত গোলাবারুদ পুনরায় মজুত করার ক্ষমতা সীমিত। একই সময়ে ওয়াশিংটনকে অন্যান্য সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য কৌশলগত রিজার্ভ ধরে রাখতে হয়। তাই ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে সব মজুত ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমাত্রার সংঘাতের জন্য প্রস্তুত বলে মনে হয় না। মুখোমুখি অবস্থান দীর্ঘায়িত হলে তা মার্কিন বাহিনীর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক যুদ্ধ প্রস্তুতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেন ঝাং জুনশে।