বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর একটি, অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও ফুটবলে চীনের ব্যর্থতা আবারও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে ৪৮-এ উন্নীত হওয়ায় এশিয়ার জন্য সরাসরি কোটা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ টি। ফলে ধারণা করা হয়েছিল, চীনের জন্য বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া এবার সহজ হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
বাছাইপর্বে ওমান, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ফিলিস্তিনের মতো দলেরও নিচে অবস্থান ছিল চীনের। তারা চূড়ান্ত পর্বে ওঠার আগেই বিদায় নেয়। ফলে ২০০২ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্নও অধরাই থেকে যায়।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং দীর্ঘদিন ধরেই ফুটবলের বড় সমর্থক। ২০১১ সালে তিনি চীনা ফুটবল নিয়ে তিনটি স্বপ্নের কথা বলেছিলেন—বিশ্বকাপে খেলা, বিশ্বকাপ আয়োজন করা এবং বিশ্বকাপ জেতা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০১৫ সালে সরকার ৫০ দফা উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বিপুল অর্থ ঢালা হয় দেশীয় লিগে, এমনকি ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবেও চীনা বিনিয়োগ বাড়তে থাকে। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, একসময় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের কোচরাও চীনা ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে উচ্চাভিলাষী এসব পরিকল্পনা সফল হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ দুর্নীতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়ন মডেল।
বর্তমানে চীনের ঘরোয়া ফুটবল ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। ম্যাচ পাতানো, জুয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগে একাধিক ক্লাব শাস্তি পেয়েছে। অনেক দল মৌসুম শুরু করেছে ‘মাইনাস’ পয়েন্ট নিয়ে। এতে লিগের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনের ক্ষেত্রে ফুটবলকে রাষ্ট্রীয় প্রকল্পে পরিণত করাও বড় ভুল ছিল। এই প্রক্রিয়ায় চীনে ফুটবল কার্যত সরকারি আমলাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। অথচ সফল ফুটবল সংস্কৃতি সাধারণত গড়ে ওঠে স্থানীয় পর্যায়ে—পাড়ার মাঠ, কমিউনিটি ক্লাব এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে। ফুটবলে সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততারও প্রয়োজন, যা শুধু নির্দেশনা দিয়ে তৈরি করা যায় না।
এদিকে চীনের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্নও ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। ২০৩০ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে মরক্কো, পর্তুগাল ও স্পেন এবং ২০৩৪ সালের জন্য সৌদি আরব নির্বাচিত হওয়ায় চীনের সামনে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সুযোগ হতে পারে ২০৪২ সাল। তবে দেশটির বর্তমান রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে ফুটবলের গুরুত্ব আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
তারপরও চীনে ফুটবলের জনপ্রিয়তা কমেনি। ২০২৩ সালে বেইজিংয়ে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রেলিয়ার প্রীতি ম্যাচে টিকিটের ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। স্টেডিয়ামের পরিবেশও ছিল উৎসবমুখর। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের মধ্যে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা এখনো অটুট।
চীনের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়—অর্থ, অবকাঠামো বা সরকারি পরিকল্পনা দিয়েই ফুটবলে সাফল্য নিশ্চিত করা যায় না। শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিভা বিকাশ এবং স্বাধীন ফুটবল সংস্কৃতি ছাড়া বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করা কঠিন। আর সেই কারণেই ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ চীন এখনো ফুটবলের অন্যতম বড় ধাঁধা হয়ে রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট অবলম্বনে