হোম > বিশ্লেষণ

ভারতের ডি-হাইফেনেশন নীতি, মোদির ইসরায়েল সফরের ৫ দিক

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

নেতানিয়াহুর সঙ্গে জেরুজালেমের ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট মেমোরিয়াল মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন নরেন্দ্র মোদি। ছবি: এএফপি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর দুই দিনের ইসরায়েল সফর শেষ করেছেন। এই সফরে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে উষ্ণ বন্ধুত্ব এবং প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে বড় ধরনের সমঝোতা হলেও, অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ ও গাজা নিয়ে মোদির নীরবতা বেশ লক্ষণীয়।

গতকাল বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই সফরে দুই নেতা তাঁদের গভীর বন্ধুত্বের কথা উল্লেখ করে একে অপরের প্রশংসা করেন এবং উদ্ভাবন ও কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু মোদিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি ইসরায়েলের একজন মহান বন্ধু...নরেন্দ্র। আপনি বন্ধুর চেয়েও বেশি কিছু, আপনি একজন ভাই।’

সফরকালে নেতানিয়াহু মোদিকে নিয়ে জেরুসালেমের ‘ইয়াদ ভাশেম’ (হলোকাস্টে নিহতদের স্মারক) পরিদর্শন করেন এবং নেসেটে ভাষণ দেওয়ার পর তাঁর সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন। মোদিকে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের সর্বোচ্চ সম্মাননাও দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের পর এটি ছিল মোদির দ্বিতীয় ইসরায়েল সফর। ভারতের ফিলিস্তিনপন্থী দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও গতবারের মতো এবারও তিনি ফিলিস্তিন সফর করেননি। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল সৃষ্টির বিরোধিতা করলেও ১৯৯২ সালে ভারত দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। মোদির এই সফরের পাঁচটি মূল বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো—

ইসরায়েলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ও গাজা নিয়ে নীরবতা

গতকাল বুধবার প্রথমবারের মতো কোনো ভারতীয় নেতা হিসেবে নেসেটে ভাষণ দেন মোদি। তিনি ঘোষণা করেন, ‘ভারত এই মুহূর্তে এবং এর বাইরেও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলাকে ‘বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে অভিহিত করে গভীর শোক প্রকাশ করেন। মোদি বলেন, ‘কোনো কারণই বেসামরিক নাগরিক হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। সন্ত্রাসবাদের কোনো অজুহাত হয় না।’ এ সময় ইসরায়েলকে ‘পিতৃভূমি’ এবং ভারতকে ‘মাতৃভূমি’ বলে উল্লেখ করেন মোদি।

মোদি ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে ভারতের নীতি আপসহীন এবং এতে কোনো দ্বিচারিতা নেই। এছাড়া তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেন, ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তির সব প্রচেষ্টায় পাশে আছে। তবে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৭২ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহতের ঘটনা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

দিল্লির পলিসি পারসপেক্টিভ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো আনোয়ার আলম বলেন, এই সফরের সময়টি ভারতের ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি ফিলিস্তিনিদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি এক ধরনের সংবেদনহীনতা।

সভ্যতাগত সম্পর্ক ও হিন্দুত্ববাদ-জায়নবাদ সমীকরণ

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভারতীয় ডানপন্থীদের জায়নবাদী আদর্শের প্রতি অনুরাগের কারণেই মোদি ইসরায়েলের প্রতি এত উষ্ণতা প্রদর্শন করছেন। মোদির দল বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদ’ দর্শন ভারতকে শুধু হিন্দুদের আবাসভূমি হিসেবে দেখতে চায়, যা ইসরায়েলের জায়নবাদী ধারণার সমান্তরাল। নেসেটে মোদি নিজেকে ‘এক প্রাচীন সভ্যতার প্রতিনিধি হিসেবে অন্য সভ্যতার প্রতি ভাষণ দানকারী’ হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ইহুদিদের ‘তিক্কুন ওলাম’ (বিশ্বকে নিরাময় করা) দর্শনের সঙ্গে ভারতীয় দর্শনের মিল দেখান।

মোদি উল্লেখ করেন, ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ভারত যখন ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, সেই দিনটিই ছিল তাঁর জন্মদিন।

প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতা বৃদ্ধি

ভারত বর্তমানে ইসরায়েলের অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা। প্রতি বছর ভারতের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের মধ্যেও ভারতীয় সংস্থাগুলো ইসরায়েলে রকেট ও বিস্ফোরক বিক্রি করেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুই নেতার আলোচনায় প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং প্রযুক্তি গুরুত্ব পায়। মোদি জানান, এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং খনিজ সম্পদের মতো খাতে সহযোগিতার জন্য ‘ক্রিটিক্যাল অ্যান্ড এমার্জিং টেকনোলজিস পার্টনারশিপ’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া দুই দেশ একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিষয়েও আলোচনা করছে।

কৌশলগত সম্পর্কের উত্তরণ

মোদির সফরের আগে নেতানিয়াহু ছয় দেশের জোটের প্রস্তাব দেন, যাতে ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাসসহ আরও কিছু দেশ থাকতে পারে। এই জোটের লক্ষ্য হিসেবে তিনি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলার কথা বলেন। এ থেকে বোঝা যায়, ভারত ও ইসরায়েল একটি বৈশ্বিক জোটের কাছাকাছি আসছে।

তবে মোদি সরাসরি এই জোটের কথা না বললেও ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোর (আইএমইসি) এবং আই২ইউ২ প্রকল্পের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আইএমইসি প্রকল্পটি রেল ও শিপিং করিডোরের মাধ্যমে ভারতকে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করবে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে এই প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ আই২ইউ২-কে ‘পশ্চিম এশিয়ার কোয়াড’ বলেও উল্লেখ করেন।

নয়াদিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি হর্ষ পান্ত বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার কারণেই এটি সম্ভব হচ্ছে।

ফিলিস্তিন থেকে দূরত্ব ও ‘ডি-হাইফেনেশন’ নীতি

ভারতের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি মূলত ‘ডি-হাইফেনেশন’ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক এখন আর ফিলিস্তিন ইস্যুর ওপর নির্ভর করবে না। মোদি তাঁর ভাষণে ইসরায়েলের আধুনিকায়নে ভারতীয় কর্মীদের অবদানের কথা বললেও, গাজায় নিহত প্রথম আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ কর্মী ভারতের কর্নেল বৈভবকালের মৃত্যু নিয়ে কোনো কথা বলেননি।

হর্ষ পান্তের মতে, কিছু আরব দেশের মতো ভারতও এখন এমন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে যেখানে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন আলাদা রেখে সম্পর্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। এই নীতিকে বলা হয় ‘ডি-হাইফেনেশন’।

২০২৩ সালে প্রকাশিত বই ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ড: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’-এর লেখক আজাদ এসা বলেন, আগে জাতীয় স্বার্থের কারণে ভারত নিজেকে ফিলিস্তিনের বন্ধু হিসেবে উপস্থাপন করত, কিন্তু এখন সেই অবস্থান বদলেছে। তাঁর মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে গভীর প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কারণে ভবিষ্যতে এই অবস্থান বদলানো বিরোধী দলগুলোর জন্যও কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, ভারতে এখন ফিলিস্তিনপন্থী হওয়াকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির প্রভাব না কাটলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ভারতের সুর বদলানো কঠিন।

ফের কেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল পাকিস্তান

নেপালে জেন-জি বিক্ষোভে নির্বিচার হত্যার নেপথ্যে পুলিশ, দায় এড়ানোর নোংরা খেলায় প্রশাসন

মার্কিন হামলা ঠেকাতে ইরানকে যেভাবে শক্তিশালী করছে চীন

মোদির ইসরায়েল সফর পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ

‘কৌশলগত অনুপ্রবেশের’ অন্ধকার গলিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রগতিশীলেরা

কেন এত ঘনিষ্ঠ ইসরায়েল–ভারত, আসন্ন সফর থেকে কী ফায়দা চান মোদি

বন্ধু ইরান দুর্বল হবে, সেই আশায় ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ ভারত

নয়া কৌশলগত আতঙ্কে ইসরায়েল, তুরস্ক কি পরবর্তী ‘ইরান’

ইসরায়েল–আমিরাতকে ঠেকাতে প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে সৌদি আরবের মহাপরিকল্পনা

ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন লারিজানি