হোম > বিশ্লেষণ

এবার রাম, পরে বাম—বাম ভোটারদের নীরব কৌশলেই কি বিজেপির বাংলা জয়

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দল (সিপিআই-এম) মাঠে ততটা শক্তিশালী না থাকায় তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আমাদের সমর্থকেরা বিজেপিকেই ভোট দিয়েছেন—এভাবেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের পেছনে বাম ভোটারদের ভূমিকার কথা বলছিলেন উত্তর চব্বিশ পরগনার নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই (এম) কর্মী রঞ্জিত রায়। আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম শিবিরের এই বিপুল জয়ের পেছনে রয়েছে কাস্তে-হাতুড়ির লাল ভোটারদের এক নীরব ভূমিকা।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন খোদ পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ৪ মে কলকাতার ভবানীপুর আসনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার পর বিজয় ভাষণে শুভেন্দু বলেন, ‘ভবানীপুরে সিপিএমের প্রায় ১৩ হাজার ভোট ছিল। তার মধ্যে অন্তত ১০ হাজার ভোট আমার বাক্সে এসেছে। আমি ভবানীপুরের সমস্ত সিপিআই (এম) ভোটারের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’

শুভেন্দুর এই জয় কেবল ভবানীপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না; দমদম উত্তরসহ রাজ্যের বহু আসনে এই একই সমীকরণ দেখা গেছে। একসময় দমদম উত্তর বামদের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এবার সেখানে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে যুবনেত্রী দীপ্সিতা ধরকে প্রার্থী করে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনা হলেও আসনটিতে জয়ী হয়েছে বিজেপি। যদিও বামপন্থীরা ক্যাডারভিত্তিক দল হিসেবে পরিচিত, তবে তাঁদের ভোটারদের এমন পরিবর্তন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চমকে দিয়েছে।

কখন ও কেন শুরু হয়েছিল এই দলবদল

পশ্চিমবঙ্গে টানা ৩৪ বছরের (১৯৭৭-২০১১) শাসক দল বামফ্রন্টের ভোটারদের এই দক্ষিণপন্থী ঝোঁক কিন্তু হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। বিশ্লেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মতে, এই পরিবর্তনের বীজ বপন হয়েছিল মূলত ২০১৮ সালের রক্তাক্ত পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়।

২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভূতপূর্ব সহিংসতা, বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে না দেওয়া ও বাম কর্মীদের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা বাম সমর্থকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। তৃণমূলকে তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় তাঁরা বিজেপিকে একমাত্র ‘লাইফ ইনস্যুরেন্স’ বা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে বেছে নিতে শুরু করেন।

ভোটারদের এই পরিবর্তনের প্রথম বড় প্রমাণ মেলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। ওই বছর বিজেপি রাজ্যে ১৮টি আসন দখল করে। তৎকালীন সিপিআই (এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও স্বীকার করেছিলেন, তৃণমূলের অবর্ণনীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে বাম সমর্থকেরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। একই ধারা বজায় ছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও, যেখানে বিজেপি ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে।

তখন মাঠপর্যায়ের এক বাম সমর্থক বলেছিলেন, ‘আমরা মনে-প্রাণে কমিউনিস্ট। কিন্তু এবার তৃণমূলকে তাড়াতে আমরা বিজেপিকে ভোট দেব। তৃণমূল চলে গেলে আমরা আবার সিপিএমে ফিরে আসব।’

‘এবার রাম, পরে বাম’ কৌশলের অন্তর্নিহিত কারণ

বিজেপি ও বামপন্থা—তাত্ত্বিকভাবে চৌম্বকের দুই বিপরীত মেরুর মতো হলেও বাংলায় তাদের এই মেলবন্ধনের পেছনে দুটি মূল কারণ কাজ করেছে।

তৃণমূলের অবদমন নীতি ও প্রতিশোধের রাজনীতি: ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে বামদের ওপর তীব্র দমন-পীড়ন চালান। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ রিয়াজ ইন্ডিয়া টুডেকে বলেন, ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মমতা বিরোধীদের কার্যত নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিলেন। বামপন্থীদের কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না দেখে সাধারণ হিন্দু বাম ভোটাররা বিজেপিকে বিকল্প মনে করতে শুরু করেন।

নিরাপদ পরিবেশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা: ২০২৬ সালের নির্বাচনে রাজ্যজুড়ে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী (সিএপিএফ) মোতায়েন করা হয়েছিল। নিউ ব্যারাকপুরের সিপিআই(এম) কর্মী কৃষ্ণেন্দু মৈত্র বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর মানুষ ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। সাধারণ মানুষ যেকোনো মূল্যে তৃণমূলের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিল। যেহেতু আমাদের সংগঠনের একা লড়াই করার মতো শক্তি ছিল না, তাই ভোটাররা চোখ বন্ধ করে বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন।’

তবে বাম কর্মীদের একাংশ দাবি করেছেন, বিজেপিকে ভোট দেওয়ার মানে এই নয় যে তাঁরা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে মেনে নিয়েছেন। এটি ছিল মূলত তৃণমূলের হাত থেকে বাঁচার ও তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার একটি সাময়িক যুদ্ধকৌশল, যা বাংলায় ‘এবার রাম, পরে বাম’ স্লোগান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনী ফলাফলে বামদের অবস্থান

বিজেপি এবার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে (৪৫ শতাংশ) সরকার গঠন করেছে। যাদবপুর, উত্তরপাড়া, দমদম, দমদম উত্তর ও আসানসোলের মতো বাম প্রভাবিত আসনগুলো এবার বিজেপির ঝুলিতে গেছে। মীনাক্ষী মুখার্জি বা দীপ্সিতা ধরের মতো হেভিওয়েট বাম তরুণ নেতারাও বিজেপির কাছে পরাজিত হয়েছেন।

তবে এই ঝড়ের মধ্যেও বামপন্থীদের জন্য কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।

২০২১ সালে বামদের ভোট যেখানে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল, ২০২৬ সালে তা সামান্য বেড়ে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের মূল সমর্থক গোষ্ঠী এখনো নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।

মুসলিম ভোট বিভাজনের সুবাদে মুর্শিদাবাদের ডোমকল আসনে জয়ী হয়েছে সিপিআই(এম)। এ ছাড়া বামপন্থী নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) ভাঙড় আসনটি তৃণমূলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।

বামপন্থীদের পুনরুত্থান কি সম্ভব

তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বাম সমর্থকেরা তাঁদের প্রথম লক্ষ্য অর্জন করেছেন। সরকার পতনের পরপরই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাম কার্যালয়গুলো ফিরে পাওয়ার খবর আসছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ২০১১ সালের পর তৃণমূলের দখল করে নেওয়া বা বন্ধ থাকা সিপিআই(এম) ও ফরওয়ার্ড ব্লকের দলীয় কার্যালয়গুলো পুনরায় বাম কর্মীদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় বিজেপি নেতারাও উপস্থিত থেকে এই কার্যালয়গুলো হস্তান্তরে সহায়তা করছেন। কোচবিহারের দিনহাটায় ফরওয়ার্ড ব্লকের কার্যালয় উদ্বোধনের সময় বিজেপি নেত্রী পিয়ালী গুপ্তার আবেগঘন উপস্থিতি তারই প্রমাণ।

তবে দীর্ঘ মেয়াদে বামদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তৃণমূলের পতনের পর রাজ্যে যে বিরোধী দলের শূন্যস্থান তৈরি হবে, বামপন্থীদের তা দ্রুত পূরণ করতে হবে। বিজেপিকে হটিয়ে লাল পতাকার পুনরুত্থান ঘটাতে হলে তাঁদের সেই সমস্ত ভোটারকে ঘরে ফেরাতে হবে, যাঁরা ‘এবার রাম’ তত্ত্বে বিশ্বাসী হয়ে সাময়িকভাবে গেরুয়া শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অন্যথায়, পরিবর্তনের এই নতুন হাওয়ায় বামপন্থীরা যদি নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে না পারেন, তবে বাংলার রাজনীতিতে তাঁদের অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।

১১ বছর আগে তৃণমূলের মঞ্চে উপেক্ষিত শুভেন্দুই আজ পশ্চিমবঙ্গের ‘মঞ্চনেতা’

ইরান যুদ্ধে বিলিয়ন ডলার আয় করেছে যেসব কোম্পানি

খালি হয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানির মজুত, তাতেই কি সুর নরম ট্রাম্পের

তিস্তা ইস্যুতে ভারতের বলা ‘নদীসংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় কাঠামো’ মূলত কী

ক্রমেই মোদির এক দলের শাসনের অধীনে চলে যাচ্ছে ভারত

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ সমাপ্ত—এর মানে কি ইরান যুদ্ধ শেষ

তামিলনাড়ুতে ঈর্ষণীয় অর্থনৈতিক সাফল্য কেন স্ট্যালিনকে বাঁচাতে পারল না

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে যেভাবে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছে বিজেপি

বিজেপির ভোট প্রকৌশল যেভাবে ধসিয়ে দিল মমতার দুর্গ

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন: এসআইআর যেভাবে বদলে দিল ভোটের ফলাফল