বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ঝংনানহাই গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দুই দিনের হাই ভোল্টেজ শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে গতকাল। এই সফরকে ওয়াশিংটন ‘বাণিজ্যিক বিজয়’ হিসেবে দেখলেও, কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে দেখছেন দুই বিশ্বশক্তির মধ্যে গভীর আস্থার সংকটের প্রতিফলন হিসেবে। সম্মেলনের পর দুই দেশের সরকারি বয়ান বা ‘রিডআউটে’র চরম বৈপরীত্য স্পষ্ট করে দিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই দুই নেতা একমত হতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, চীনের সঙ্গে ‘ফ্যান্টাস্টিক’ বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষত, প্রায় এক দশক পর চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে রাজি হয়েছে বলে ট্রাম্প ফক্স নিউজকে জানিয়েছেন।
তবে এ ঘোষণাতেও মুদ্রার উল্টো পিঠ রয়েছে। বাজারের প্রত্যাশা ছিল ৫০০টি বিমানের, যা না হওয়ায় গতকাল শুক্রবার বোয়িংয়ের শেয়ার সূচক ৪ শতাংশের বেশি পড়ে গেছে। মজার ব্যাপার হলো, চীনের সরকারি বিবৃতিতে এই সুনির্দিষ্ট ক্রয়াদেশের কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে এই সফরে যোগ দিলেও, চীনে উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তোলার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। সি চিন পিং শুধু বাজার আরও উন্মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা কয়েক বছর ধরেই বেইজিং বলে আসছে।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই নেতার আলোচনার ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায় সে বিষয়ে দুই দেশ একমত।
তবে চীনের বিবৃতিতে কিন্তু ‘পারমাণবিক’ শব্দটি সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা শুধু বলেছে, এই যুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল না। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, প্রণালিতে ইরান কর্তৃক ‘টোল’ বা মাশুল আদায়ের বিরোধী চীন। কিন্তু চীনের বিবৃতিতে শুধু বিশ্ব সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীন গোপনে ইরানের সঙ্গে তাদের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায় বলেই যুক্তরাষ্ট্রের সুরে সুর মেলায়নি।
এই সম্মেলনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ ছিল তাইওয়ান। সি চিন পিং অত্যন্ত কড়া ভাষায় ট্রাম্পকে জানিয়েছেন, তাইওয়ান ইস্যুটি সিনো-মার্কিন সম্পর্কের ‘রেড লাইন’। যদি যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানে অস্ত্র সরবরাহ বা হস্তক্ষেপ বন্ধ না করে, তবে দুই দেশ সরাসরি যুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে।
ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে তাইওয়ান-সংক্রান্ত প্রশ্ন সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী তারা তাইওয়ানকে সুরক্ষা দিতে দায়বদ্ধ, কিন্তু চীনের মাটিতে দাঁড়িয়ে সরাসরি সংঘাতের পথে যেতে চাননি ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের চূড়ান্ত বিবৃতিতে তাইওয়ানের নাম না থাকা ইঙ্গিত দেয়, ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে চীনের সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা কমাতে চাচ্ছে।
ট্রাম্প শুরু থেকেই চীনা উৎপাদিত ফেন্টানাইল প্রি-কারসারকে যুক্তরাষ্ট্রের মাদকসংকটের জন্য দায়ী করে আসছিলেন এবং এর জেরেই গত বছর চীনা পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করেছিলেন। হোয়াইট হাউসের দাবি, এই পাচার রুখতে দুই দেশ একমত হয়েছে। কিন্তু চীনের বিবৃতিতে ড্রাগ বা মাদকসংক্রান্ত কোনো প্রসঙ্গের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে, বেইজিং এই অভিযোগকে এখনো গুরুত্ব দিতে নারাজ।
চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দাবি, দুই নেতা আগামী তিন বছরের জন্য সম্পর্কের একটি ‘কনস্ট্রাকটিভ ভিশন’ বা গঠনমূলক রূপরেখা তৈরি করেছেন। অথচ হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে এই ‘তিন বছরের টাইমলাইনে’র কোনো উল্লেখ নেই। যুক্তরাষ্ট্র মূলত বর্তমান অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দিলেও চীন দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে চাচ্ছে।
মোটকথা, ট্রাম্প-সি বৈঠক বিশ্ব রাজনীতিতে কোনো জাদুকরী সমাধান আনতে পারেনি। বরং এটি দুই দেশের মধ্যকার ‘পাওয়ার গেম’ বা শক্তির লড়াইকে আরও স্পষ্ট করেছে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং সি চিন পিংয়ের ‘চায়না ড্রিম’—এই দুই বিপরীতমুখী আদর্শের মধ্যে যে শীতল যুদ্ধ চলছে, এই সফর তার এক অস্থায়ী বিরতি মাত্র। আগামী দিনে তাইওয়ান ইস্যু এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এই সম্পর্কের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা