হোম > বিশ্লেষণ

তেলের যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে ইরান: জাপানের সঙ্গে আলোচনায় তেহরান, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে যখন বারুদের গন্ধ, তখন কূটনৈতিক টেবিলে এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ দিয়েছে ইরান। মার্কিন মিত্র জাপানকে নিজেদের পক্ষে টানতে তেহরান যে বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে তেলের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পর ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো পুনরায় ইরানি তেল আমদানির তোড়জোড় শুরু করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তিনি জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে টোকিওকে একটি আকর্ষণীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে: জাপানি পতাকাবাহী জাহাজগুলো কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বা বাধা ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি ইরানের একটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে জাপানসহ তার প্রধান মিত্রদের অনুরোধ জানিয়েছে যাতে তারা হরমুজ প্রণালি বলপূর্বক উন্মুক্ত রাখতে সেখানে যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। তেহরান খুব ভালো করেই জানে, জাপানি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অর্থ হলো সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। জাপানি প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে গিয়ে প্রতিবেশী দেশ ও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ‘হামলার’ নিন্দা জানালেও, তেহরান এই বিশেষ প্রস্তাবের মাধ্যমে টোকিওকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছে যাতে তারা মার্কিন সামরিক জোটে যোগ না দেয়। এই চালের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে দুটি বার্তা দিচ্ছে—প্রথমত, হরমুজ প্রণালির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতে; এবং দ্বিতীয়ত, যারা তাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াবে না, তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে।

এদিকে, ঘরের বাজারে জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম এবং আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার চাপে পড়ে ট্রাম্প প্রশাসন এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সমুদ্রপথে থাকা ইরানি তেলের ওপর ৩০ দিনের একটি বিশেষ ‘সেফ প্যাসেজ’ বা ছাড় ঘোষণা করেছে। এই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করতে চাচ্ছে ভারতের বিশাল তেল শোধনাগারগুলো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সূত্র অনুযায়ী, ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনসহ বেশ কিছু সরকারি ও বেসরকারি শোধনাগার ইতিমধ্যে তেলের কার্গো বুক করার প্রস্তুতি শুরু করেছে।

মার্কিন ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ (ওএফএসি)-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০ মার্চের আগে লোড করা হয়েছে ইরানের এমন প্রায় ১৭০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এখন আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির বৈধতা পেয়েছে। কেপলার-এর তথ্যমতে, এই তেলের বিশাল একটি অংশ বর্তমানে পারস্য উপসাগর থেকে চীন সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় ট্যাংকারে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই সাশ্রয়ী তেল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এই তেল কেনা ও খালাস করার প্রক্রিয়াটি খুব একটা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক ব্যবসায়ীরা। যদিও ৩০ দিনের একটি উইন্ডো দেওয়া হয়েছে, তবুও একটি বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার খালাস করা এবং এর আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা সময়সাপেক্ষ। অনেক ব্যাংক এখনো ইরানি তেলের লেনদেনে অর্থায়ন করতে দ্বিধাবোধ করছে। এ ছাড়া বিমা সংক্রান্ত জটিলতা এবং কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে গিয়ে সরবরাহ সম্পন্ন হতে ১৯ এপ্রিলের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একই সঙ্গে দুটি ফ্রন্টে লড়াই করছে। একদিকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করছে, অন্যদিকে মিত্রদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ওয়াশিংটনকে কূটনৈতিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা করছে। ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে ইরানকে ধ্বংস করার হুমকি দিচ্ছে, আবার অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপে পড়ে ইরানের তেলই বাজারে ছাড়ার অনুমতি দিচ্ছে—এই বৈপরীত্য মার্কিন মিত্রদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলোর যুদ্ধের প্রতি অনীহা এবং এখন জাপানের প্রতি তেহরানের নমনীয় মনোভাব ট্রাম্পের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতিকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

এখন দেখার বিষয়, জাপানের মতো দেশগুলো ইরানের এই ‘দ্বিপক্ষীয়’ প্রস্তাব গ্রহণ করে কি না। যদি এশিয়ার দেশগুলো বড় আকারে ইরানি তেল কেনা শুরু করে এবং মার্কিন সামরিক জোট থেকে দূরে থাকে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে।

ইরান আক্রমণ: ৫০ বছর কোনো প্রেসিডেন্ট সাহস করেননি, ট্রাম্প কেন ঝুঁকি নিলেন

জ্বালানি স্থাপনায় পাল্টাপাল্টি হামলায় উন্মুক্ত ‘প্যান্ডোরার বাক্স’, উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এখন তেহরানের হাতে

লক্ষ্য অর্জনে বারবার ব্যর্থ, তবুও কেন গুপ্তহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল

ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন নয়: ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রটি অন্য কিছু

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য আলাদা

জ্বালানি স্থাপনায় হামলা: নয়া পর্যায়ে যুদ্ধ, উপসাগরীয় দেশগুলো কি ইরানে পাল্টা আঘাত হানবে

চার্চিলের তেলের লোভ, খোমেনির দর্শন: মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার আদিপাপ

আলী লারিজানি: নিভৃতচারী দার্শনিক থেকে কট্টর রাজনীতিক হয়ে উঠেছিলেন যেভাবে

শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে হাত ছিল ইসরায়েলের: গোপন নথি প্রকাশ

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা: আলোচনার পথ রুদ্ধ করার কৌশল ইসরায়েলের