যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে অবসানের লক্ষ্যে নতুন করে ১৪ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এ যুদ্ধের কারণে একদিকে মার্কিন সামরিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা যেমন স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও নাড়িয়ে দিয়েছে। এই নতুন প্রস্তাবের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি এটি পর্যালোচনা করছেন। তবে এতে কোনো স্থায়ী চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে তেহরান প্রস্তাবটি পাকিস্তানের কাছে পাঠায়। এর আগে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে পাকিস্তানই মধ্যস্থতা করেছিল। ইরানি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৯ দফা শান্তি প্রস্তাবের বিপরীতে ইরান এই ১৪ দফা পরিকল্পনা পেশ করেছে। প্রস্তাবের মূল বিষয়গুলো হলো—
৩০ দিনের মধ্যে সমাধান: ইরান চায় যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত না করে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে এবং ৩০ দিনের মধ্যে সব বিরোধ নিষ্পত্তি করতে।
নিরাপত্তা ও প্রত্যাহার: ভবিষ্যতে আর কোনো হামলা না হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান, ইরানের আশপাশ থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধ করা।
অর্থনৈতিক দাবি: ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ থাকা কয়েক বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করা এবং যুদ্ধের ফলে যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ‘ক্ষতিপূরণ’ দেওয়া।
হরমুজ প্রণালি: হরমুজ প্রণালির জন্য একটি ‘নতুন ব্যবস্থা’ বা মেকানিজম তৈরি করা।
উল্লেখ্য, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষরকারী হিসেবে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে অনড়। তবে ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ‘রেড লাইন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি বিপর্যস্ত করায় যে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা প্রত্যাহারকে যেকোনো চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখছে তেহরান।
প্রস্তাবটি পেশ করার পর ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি বলেন, এখন কূটনীতির নাকি সংঘাতের পথ—তা বেছে নেওয়ার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ মনে করেন, ইরান তাদের অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, ইরান হয়তো তাদের আগের শর্ত (যুক্তরাষ্ট্রকে অবরোধ তুলে নিতে হবে) থেকে কিছুটা সরে এসেছে। তবে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ ও উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের মতো বড় ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখনো অনেক দূরে। আবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও অনড়—ইরানকে অবশ্যই তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে।
নিউইয়র্কভিত্তিক থিংকট্যাংক সুফান সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো কেনেথ কাটজম্যানের মতে, বড় বাধা হলো ইরানের অবিশ্বাসের জায়গাটি। তিনি বলেন, পারমাণবিক ইস্যুর চেয়েও বড় সমস্যা হলো ইরান ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না। অবরোধ না উঠলে তারা পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় যেতে নারাজ।
ট্রাম্প বলেছেন, তিনি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছেন, তবে তেহরান যদি ‘খারাপ কিছু’ করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক হামলা শুরু করতে পারে। গতকাল শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ভালো অবস্থানে রয়েছে। ইরান চলমান সংঘাত ও নৌ অবরোধে ‘বিপর্যস্ত’ হওয়ায় এখন সমঝোতা চাইছে।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানের এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হবে বলে মনে হয় না। কারণ, গত ৪৭ বছরে বিশ্ব ও মানবতার বিরুদ্ধে ইরান যা করেছে, তার যথেষ্ট মূল্য তারা এখনো দেয়নি।’
ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের বিষয়ে অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভবত প্রস্তাবটি ভালোমতো পড়ার আগেই তা প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। এর আগে গত ২৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা পরিকল্পনা দিয়েছিল, যার মধ্যে নাতানজ, ইসফাহান ও ফোরদোর পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কাছে হস্তান্তরের শর্ত ছিল। ইরান তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ৭ এপ্রিল ইরান ১০ দফার একটি পরিকল্পনা দেয়, যা ট্রাম্প ‘গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু যথেষ্ট নয়’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
যুদ্ধবিরতি চললেও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ‘পূর্ণ প্রস্তুতি’ নিয়ে রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র অতীতে করা চুক্তি মানেনি। আইআরজিসির গোয়েন্দা ইউনিট জানিয়েছে, ট্রাম্পের সামনে এখন দুটি পথ—অসম্ভব কোনো সামরিক অভিযান অথবা ইরানের সঙ্গে কঠিন কোনো সমঝোতা।
হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইনের উপস্থিতিসহ বিভিন্ন কারিগরি ও ভৌত বাধার কারণে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে গত ১৩ এপ্রিল থেকে মার্কিন নৌ অবরোধের ফলে ইরানের তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে; যুদ্ধের আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৫ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ১১১ ডলার ছাড়িয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তেলবাহী জাহাজ জব্দ করার ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যেই কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি দাবি করেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ওই জলসীমায় অনেকটা ‘জলদস্যুর’ মতো কাজ করছে। গতকাল ফ্লোরিডায় এক জনসমাবেশে তিনি মার্কিন বাহিনীর অভিযানের প্রশংসা করে একে একটি ‘লাভজনক ব্যবসা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে, তেহরান একে ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের ট্রিটা পারসি বলেন, এই অবরোধ ট্রাম্পের জন্য উল্টো বিপদ ডেকে এনেছে। কারণ, এটি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে এবং কূটনৈতিক আলোচনার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন মেরিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট (এমএফসি) নামে একটি নতুন নৌ জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা