হোম > বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেভাবে পুরো এশিয়ার সংকটে রূপ নিচ্ছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আইএমএফের গবেষণা অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পেছনেও জ্বালানি সংকটের বড় ভূমিকা ছিল।

ইরান যুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাত এখন মহাসাগর পেরিয়ে এশিয়াতেও অনুভূত হচ্ছে। গত সপ্তাহে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান বালকৃষ্ণান চলমান যুদ্ধকে সরাসরি ‘এশিয়ার সংকট’ হিসেবে অভিহিত করেন। এর কারণ স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণত যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস পার হয়, তার ৮০ শতাংশ তেল এবং ৯০ শতাংশ গ্যাসই এশিয়ার বাজারের জন্য নির্ধারিত। সেই হরমুজ প্রণালি এখন অচল। ফলে সংকটে পড়েছে গোটা এশিয়া।

এই সংকটে দরিদ্র দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফিলিপাইনের মোট জ্বালানি আমদানির ৯০ শতাংশের বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান তাদের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পায় এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে। তবে এশিয়ার ধনী দেশগুলোও এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়।

১৯৭০-এর দশকের তেলসংকটের পর জাপান ২৫৪ দিনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো তেলের মজুত গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বর্তমান সংকটে দেশটিতে বাস ও ফেরি চলাচল সীমিত করা হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে জাপানি ঐতিহ্যবাহী বাথ-হাউসগুলো খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে এবং অনেকগুলো সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি জাপানের জনপ্রিয় স্ন্যাকস নির্মাতা ‘ইয়ামায়োশি সিকা’ তাদের ফ্রায়ারের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় আলুর চিপস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।

এশীয় অর্থনীতির তিন প্রধান ঝুঁকি

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার ফলে প্রথম বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। এটি অন্যান্য উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেবে, যা ‘স্ট্যাগফ্লেশনারি’ বা স্থবিরতা ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চক্র তৈরি করতে পারে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব অনুভব করছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চালকেরা।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বজুড়ে পেট্রলের দাম ১৪ শতাংশ বাড়লেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এই বৃদ্ধির হার ৪২ শতাংশ। বিশেষ করে ফিলিপাইন ও মিয়ানমারে এই দাম ৭০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশের মতো দেশে পাম্পগুলোতে এখনো এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি অনুভব করা যাচ্ছে না। কারণ, সেখানকার সরকার জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করে। গত ২৭ মার্চ ভারত সরকার ঘোষণা করেছে, তারা পেট্রল ও ডিজেলের ওপর কেন্দ্রীয় আবগারি শুল্ক কমিয়ে দেবে যাতে পাম্পে তেলের দাম না বাড়ে। অস্ট্রেলিয়া এবং ভিয়েতনামও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, যারা তাদের তেলের ৭০ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে, সেখানেও সরকার দামের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।

সরকারি বাজেটে চাপ: দ্বিতীয় ঝুঁকিটি হলো এশীয় দেশগুলোর সরকারি ব্যালেন্স শিট বা বাজেটের ওপর চাপ। অনেক দেশ আগে থেকেই জ্বালানিতে ব্যাপক ভর্তুকি দিচ্ছে, কিন্তু এই ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা সব দেশের সমান নয়। ইন্দোনেশিয়ায় জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ার ফলে দেশটি তাদের জিডিপির ৩ শতাংশের ঘাটতি সীমা অতিক্রম করার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।

অন্যদিকে অর্থসংকটে থাকা পাকিস্তান, যারা আইএমএফের নজরদারিতে রয়েছে, তারা ইতিমধ্যে তেলের দাম ২০ শতাংশ বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এ ধরনের চাপ মুদ্রার মান কমিয়ে দিতে পারে, যা বিদেশি ফটকাবাজদের প্রলুব্ধ করবে। এমনকি জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ও ইয়েনের মান ধরে রাখতে তেলের ফিউচার মার্কেটে হস্তক্ষেপের কথা ভাবছে।

অনিবার্য মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যসংকট: যেসব দেশে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে না, সেখানে অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য সরাসরি মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেবে। ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের মতো দুর্বল মুদ্রা ও বিশাল তেলের বিল থাকা দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগবে। তবে যেসব দেশ দাম নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানেও সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হওয়ার কারণে রাসায়নিক ও লজিস্টিক খাতের খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।

সবচেয়ে বড় আঘাত আসতে পারে খাদ্যের ওপর দিয়ে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত বৈশ্বিক সার বাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই যুদ্ধে আটকা পড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে এশিয়ায় মূল্যস্ফীতি মাত্র ২ দশমিক ১ শতাংশ হবে, কিন্তু এখন তারা সতর্ক করেছে যে যুদ্ধের স্থায়ীত্বের ওপর ভিত্তি করে এটি ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জ্বালানি প্রাপ্যতা ও পরিবহন খাতে বিপর্যয়

মূল্যস্ফীতি যদি অর্থনৈতিক সমস্যা হয়, তবে জ্বালানির প্রাপ্যতা হলো ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। জাপানের ২৫৪ দিনের এবং চীনের ১০০ দিনের তেলের মজুত থাকলেও ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডের মজুত মাত্র তিন সপ্তাহের সাধারণ চাহিদার সমান। এই ঘাটতি ইতিমধ্যে বিমান চলাচল ও পর্যটন খাতকে বিপর্যস্ত করেছে।

চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া জেট ফুয়েল রপ্তানি সীমিত করেছে। গত সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে বাতিল হওয়া ফ্লাইটের অর্ধেকই ছিল এশিয়ার বিমানবন্দরগুলোর। এয়ার নিউজিল্যান্ড ১ হাজার ১০০টি ফ্লাইট বাতিল করেছে। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র সতর্ক করেছেন, বিমান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি আসতে পারে।

বিকল্প জ্বালানি ও কয়লার প্রত্যাবর্তন

এই ধাক্কা এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও শুষে নিতে পারে। এডিবির মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট কমতে পারে। এর ফলে এশিয়ার দেশগুলো এখন সৌরশক্তি এবং ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা

ভিয়েতনাম রাশিয়ার সহায়তায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির ঘোষণা দিয়েছে। তবে এশিয়া তার পুরোনো শক্তির উৎস ‘কয়লা’র দিকেও ফিরে যাচ্ছে। জাপান তাদের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর থাকা কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সেগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানোর অনুমতি দিয়েছে। ভারতের গুজরাটেও বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র পুনরায় চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কয়লার দিকে এই ঝুঁকে পড়ার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। এশীয়রা জ্বালানির দামের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর প্রতিবাদে তারা রাজপথে নামতে দ্বিধা করবে না। ফিলিপাইনে ইতিমধ্যে পরিবহন শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেছেন। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দক্ষিণ এশিয়ায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো সবার মনে আছে।

আইএমএফের গবেষণা অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের পেছনেও জ্বালানি সংকটের বড় ভূমিকা ছিল। ফলে যা এখন জ্বালানি সংকট হিসেবে শুরু হয়েছে, তা অচিরেই একটি রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

মার্কিন হামলার সুবাদে হরমুজে ইরানের টোল বুথ, লেনদেন চলছে যেভাবে

যুদ্ধে পকেট ভারীর পাঁয়তারা

এখনো ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম ইরান, ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে দিল মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য

হরমুজ প্রণালি শুধু তেলের জন্য নয়

কার্পেট বোম্বিং করে ইরানকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে দেওয়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের

ট্রাম্পের যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু মূল্য দিতে হবে গোটা বিশ্বকে

ইরান যুদ্ধ নিয়ে অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যানের ‘ডার্ক থিওরি’

যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি-শূন্য প্রথম দেশ হওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

হেগসেথ কি আরও ধনী হওয়ার জন্য ইরানিদের হত্যা করছেন

খাদের কিনারায় পাকিস্তান: ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতার ঝুঁকি নাকি বৈশ্বিক পুনরুত্থানের সুযোগ