২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১৪ বছর পর কনজারভেটিভ পার্টিকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। দলের নেতা কিয়ার স্টারমারকে তখন অনেকেই ব্রিটেনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আশা হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি দলীয় নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে এক দশকের মধ্যে ব্রিটেন নতুন করে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।
ক্ষমতায় আসার সময় স্টারমার লেবার পার্টিকে শতাব্দীর সবচেয়ে বড় নির্বাচনী জয় এনে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত কমতে শুরু করে। নানা বিতর্ক, ভুল সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক চাপে শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়েছে।
স্টারমারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হয়েছিল কয়েকটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে। তিনি ধনী পেনশনভোগীদের শীতকালীন জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করেন, প্রতিবন্ধীদেরও কিছু ভাতা কাটার উদ্যোগ নেন এবং কিছু বিতর্কিত উপহার গ্রহণের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়েন। এ ছাড়া জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কে জড়ানো পিটার ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তও তাঁর জন্য সমস্যার কারণ হয়।
তবে শুধু এসব সিদ্ধান্তই তাঁর পতনের কারণ নয়। স্টারমার এমন একটি দেশ পেয়েছিলেন, যা দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ ঋণ এবং ধীরগতির প্রবৃদ্ধিতে ভুগছিল। মানুষ দ্রুত পরিবর্তন আশা করলেও তিনি শুরু থেকেই সতর্ক বার্তা দেন—পরিস্থিতি ভালো হতে সময় লাগবে। এতে অনেক ভোটার হতাশ হন।
সমালোচকদের মতে, স্টারমারের বড় দুর্বলতা ছিল তিনি নিজের কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শ জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেননি। ফলে মানুষ বুঝতে পারেনি তাঁর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী।
ক্ষমতায় আসার আগে লেবার পার্টি কর না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু সরকারে এসে অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পড়ে তারা ব্যয় কমানোর পথে হাঁটে। এর ফলে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের সুবিধা কমানোর মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরে জনরোষের মুখে কিছু সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে হলেও ততক্ষণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
অভিবাসন নীতিতেও স্টারমারকে বারবার অবস্থান বদলাতে হয়েছে। কখনো কঠোর, কখনো নমনীয় অবস্থান নেওয়ায় অনেক ভোটারের কাছে তাঁর নীতি অস্পষ্ট বলে মনে হয়েছে।
অন্যদিকে বিভিন্ন উপহার গ্রহণের ঘটনা তাঁর দুর্নীতিবিরোধী ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় পিটার ম্যান্ডেলসনকে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ নিয়ে। এ বিষয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন জবাবদিহি করতে হয়।
গত মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির খারাপ ফল এবং সাম্প্রতিক একটি উপনির্বাচনে দলের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা অ্যান্ডি বার্নহামের বড় জয় স্টারমারের অবস্থান আরও দুর্বল করে দেয়। এরপরই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
পদত্যাগের ঘোষণায় স্টারমার বলেন, দেশের স্বার্থকে তিনি সব সময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তবে অনেক বিশ্লেষকের মতে, তিনি একজন দক্ষ প্রশাসক হলেও বর্তমানের দ্রুতগতির, গণমাধ্যমনির্ভর রাজনীতির সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি। তাই বিপুল বিজয়ের মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।