হোম > বিশ্লেষণ

ইরানের ‘হরমুজ কার্ড’ কি বুমেরাং হতে পারে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বর্তমানে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চলছে। তেহরানের রাজপথে এখন বিজয়ের আমেজ; দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ‘চূড়ান্ত বিজয়’ ঘোষণা করেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক বিশ্লেষকও মনে করছেন, তীব্র মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার পরও ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতির টনক নাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে তারা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।

কিন্তু খ্যাতনামা ভূরাজনীতি বিশ্লেষক ও টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক ববি ঘোষের বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। তাঁর মতে, ইরান যা অর্জন করেছে তা ‘শক্তি’ নয়, বরং ‘সহনশীলতা’। একটি রাষ্ট্র কেবল টিকে থাকার মাধ্যমেই জয়ী হতে পারে না, যদি তার অবকাঠামো, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ভিত্তি ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং ডজনখানেক শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কমান্ডার নিহত হন। এটি ইরানের শাসনব্যবস্থার জন্য একটি ‘বডি ব্লো’ বা মারাত্মক আঘাত। খামেনির পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে তড়িঘড়ি করে স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে। ববি ঘোষের মতে, কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতার জায়গায় অপেক্ষাকৃত অখ্যাত একজনকে বসানো ‘প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিস্থাপকতা’র লক্ষণ হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই রাষ্ট্রের শক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়।

ইরানের সামরিক শক্তির যে খতিয়ান এখন পাওয়া যাচ্ছে, তা রীতিমতো কোমর ভাঙা অবস্থা। দেশটির প্রচলিত নৌ ও বিমানবাহিনী এবং রাডার ও ডিটেকশন সিস্টেমসহ বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার বড় অংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২২ সালে ইরানের হাতে প্রায় তিন হাজার ব্যালিস্টিক মিসাইল ছিল। ২০২৪ সালের ইসরায়েল যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের ফলে এই ভান্ডার এখন তলানিতে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে ইরানের মিসাইল উৎপাদন কারখানা ও সংরক্ষণাগারগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে, যা পুনর্গঠন করা সময়ের ব্যাপার।

ইরান সরকার কেবল তিন হাজার বেসামরিক মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও সামরিক বাহিনীর নিহতের সংখ্যা তারা সুকৌশলে গোপন করেছে। হামলার তীব্রতা বিচার করলে এই সংখ্যা বহুগুণ বেশি হওয়া স্বাভাবিক।

ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য ছিল হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বিশ্ববাজারে ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ আটকে দেওয়া। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। কিন্তু ববি ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, এই অস্ত্র কি বারবার ব্যবহার করা যাবে? ইরান এবার সফল হয়েছে। কারণ, তারা প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ধরতে পেরেছিল। কিন্তু ভবিষ্যতে মার্কিন, ইসরায়েলি এবং আরব সামরিক পরিকল্পনাকারীরা কড়া হিসাব-নিকাশ কষেই যুদ্ধে নামবে।

এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ পাইপলাইনের সক্ষমতা এখন দ্রুত বৃদ্ধি করা হবে। ফলে ভবিষ্যতের অবরোধে বিশ্বের ওপর ইরানের নির্ভরশীলতা কমে আসবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করলে ইরানের নিজের তেল রপ্তানিও বন্ধ হয়ে যায়। এবার ট্রাম্প প্রশাসন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানের ট্যাংকারগুলোকে ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু ভবিষ্যতে প্রতিপক্ষ হয়তো উল্টো ইরানের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করবে।

ইরানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত ভুল ছিল প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর (সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতার) ওপর মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালানো। ইরান ভেবেছিল চাপের মুখে তারা ওয়াশিংটনকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করবে। কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। আরব দেশগুলো এখন ইরানের ওপর আস্থা হারিয়ে সরাসরি মার্কিন শিবিরের দিকে ঝুঁকেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক জোটে যোগ দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ইরান তার প্রতিবেশীদের মনে যে ‘দ্বিধা’ তৈরি করে রেখেছিল, এই যুদ্ধের মাধ্যমে তা শেষ হয়ে গেল।

ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই পঙ্গু ছিল। এখন তার ওপর যুক্ত হয়েছে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা এবং পুনর্গঠনের বিশাল ব্যয়। হরমুজ প্রণালি থেকে টোল আদায় করে এই ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। যতক্ষণ না ট্রাম্প প্রশাসন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ ইরানের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আর ট্রাম্পের মতো নেতার কাছ থেকে এমন ছাড় পাওয়া বর্তমান পরিস্থিতিতে অসম্ভব বলেই মনে হয়।

ববি ঘোষের মতে, ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের নিরাপত্তা দর্শন ছিল একের পর এক ‘অপ্রতিসম উদ্ভাবন’। প্রথমে তারা প্রক্সি নেটওয়ার্ক (হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতি) তৈরি করেছিল, যা বর্তমানে কোণঠাসা। এরপর তারা মিসাইল আক্রমণের কৌশল নিয়েছিল, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। সবশেষে তারা ‘হরমুজ অস্ত্র’ ব্যবহার করল, যা একবারের জন্য কার্যকর হলেও দীর্ঘ মেয়াদে অকেজো হয়ে যাবে।

পরিশেষে মোজতবা খামেনি হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো আস্ফালন করতে পারেন, কিন্তু তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন একটি বিধ্বস্ত দেশ। ইরান টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল, একা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

এবার হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের জুয়া, রাশিয়ার চালে ভেস্তে যেতে পারে ‘মাস্টারপ্ল্যান’

৩১ বছর পর প্রত্যক্ষ সংলাপে ইসরায়েল-লেবানন, হিজবুল্লাহকে ছাড়া কি সমাধান সম্ভব

১৮৫৭ সালে ডেনমার্ককে ক্ষতিপূরণ দিয়ে টোল বন্ধের বাস্তবতা হরমুজে

ভবিষ্যতে যুদ্ধে জয়ের চেয়ে কঠিন হবে সত্যকে বাঁচিয়ে রাখা

নীরবে পেট্রোডলার চুক্তি বাতিল সৌদির, পেট্রোইউয়ানের উত্থান ঠেকাতেই ইরান যুদ্ধ

নৌ-অবরোধ কী, হরমুজ প্রণালিতে কীভাবে কাজ করবে এই মার্কিন রণকৌশল

ট্রাম্পের ‘ফাইনাল ডিল’ কখনোই ফাইনাল হয় না, ব্যর্থতার নজির শতভাগ

হরমুজে নৌ অবরোধের অর্থ কী, বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কি ন্যাটো টিকবে

আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী দুই পক্ষই, নজর ট্রাম্পের দিকে