হোম > বিশ্লেষণ

গণতন্ত্রের গভীরতর সমস্যাকে উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

প্রতীকী ছবি

দেড় বছর আগে যখন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটেছিল, তখন মনে হয়েছিল বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের পিছু হটার প্রবণতাকে রুখে দিতে প্রস্তুত। দশকের পর দশক ধরে ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে আসা সেই মুহূর্তটি কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে এক আশার আলো হয়ে দেখা দিয়েছিল। এটি ছিল একটি চাক্ষুষ প্রমাণ যে, আধুনিক যুগেও জনশক্তি চাইলে যেকোনো শক্তিশালী স্বৈরাচারী কাঠামো ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু আজ যখন দেশ একটি জাতীয় নির্বাচনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন সেই রঙিন স্বপ্নগুলো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন হতে শুরু করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর একটি সুন্দর ও শান্তিময় সময়ের প্রত্যাশা করা হলেও, গত ১৮ মাস ধরে দেশজুড়ে নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশের এই অভিজ্ঞতা একটি রূঢ় সত্যকে সামনে এনেছে—গণতন্ত্র কেবল ভোটের ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি টিকে থাকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্তম্ভের ওপর। যখন আদালত, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং আমলাতন্ত্রকে বছরের পর বছর ধরে একটি দলের স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন কোনো ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আজ সেই প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার এক করুণ উদাহরণ।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে দুই নেত্রী—আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপির খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত ও দলীয় আপসহীন অবস্থানকে কেন্দ্র করে। এই দুই বড় দলের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য খুব বেশি না থাকলেও, ক্ষমতার লড়াই ছিল চরম সংঘাতময়। ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে একসময় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হলেও, ২০১১ সালে শেখ হাসিনা তা বিলুপ্ত করেন। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যা আজ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্বজুড়ে বড় আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু একটি চরমভাবে রাজনীতিকীকরণ হওয়া এবং ভেঙে পড়া প্রশাসনিক কাঠামোতে শৃঙ্খলা ফেরানো তাঁর পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের চেইন অব কমান্ড এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি, কারণ বিগত সরকারের শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কর্মকর্তাদের অনেকেই এখন আত্মগোপনে বা ভয়ে নিষ্ক্রিয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চড়া মূল্যস্ফীতি এবং স্থবির মজুরি বৃদ্ধির চাপে পিষ্ট হচ্ছে, যা গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জনমনে হতাশা সৃষ্টি করছে।

বৃহস্পতিবারের (১২ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিরত রাখা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ছায়া ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করেছে। বর্তমানে বিএনপি এবং দলের নেতা তারেক রহমানকে ফ্রন্ট-রানার মনে করা হলেও, ২০০৮ সালের পর কোনো প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সাধারণ নির্বাচন না হওয়ায় ভোটাভুটি কোন দিকে যাবে তা বলা কঠিন। এবারের ভোটারদের প্রায় ৪৩ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী তরুণ। জরিপ অনুযায়ী, এই জেনারেশন-জেড বা জেন-জি আগের প্রজন্মের দলীয় সংঘাতের চেয়ে কর্মসংস্থান, সুশাসন, আধুনিক শিক্ষা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের মতো বাস্তবসম্মত বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার সুযোগে দেশের ইসলামি দলগুলো বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। জরিপ বলছে, প্রায় ৩৭ শতাংশ নতুন ভোটার জামায়াতের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন। দলটি সাংগঠনিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে বিকল্প শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করলেও, অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আবির্ভাব ধর্মনিরপেক্ষতার মূলভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ব্লাসফেমি আইন বা তথাকথিত ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবি দেশের প্রগতিশীল অংশকে শঙ্কিত করে তুলছে।

নির্বাচনের পাশাপাশি একটি নতুন জাতীয় সনদের ওপর গণভোট হতে যাচ্ছে। এই সনদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বিএনপি এই সনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারার বিরোধিতা করছে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে গণভোটে এটি পাস হলেও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এর বাস্তবায়ন অসম্ভব হতে পারে।

আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দুই দেশের বাণিজ্য ও জনযোগাযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক সংরক্ষণবাদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য আগামী দিনগুলোতে আরও কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সারা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবাণী। আরব বসন্ত থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কার ‘আরাগলায়া’—সবক্ষেত্রেই দেখা গেছে, রাজপথের লড়াইয়ে স্বৈরাচারকে ক্ষমতাচ্যুত করা গেলেও, নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া গণতান্ত্রিক উত্তরণ টেকসই হয় না। স্বৈরশাসকদের পতন ঘটানো হয়তো সহজ, কিন্তু তারা রাষ্ট্রযন্ত্রের যে ক্ষতি করে দিয়ে যায়, তা মেরামত করাই একটি জাতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের এই নির্বাচন কি সেই মেরামতের শুরু হবে, নাকি নতুন কোনো অস্থিরতার সূচনা করবে—তা সময়ই বলে দেবে।

লেখক: জাহিদ হোসেন, বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ

টম ফেলিক্স জেঙ্ক, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এবং দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি

এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্নো ও সহিংস ভিডিও দেখতে হচ্ছে ভারতীয় নারীদের

বাংলাদেশের নির্বাচন বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য

স্পেসএক্স–এক্সএআই একীভূতকরণ: রকেট আর এআইকে কেন এক সুতোয় বাঁধছেন মাস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে যুদ্ধে যেভাবে জেতার পরিকল্পনা করছে ইরান

গাদ্দাফিপুত্র সাইফের ‘মৃত্যু’ নয়, দীর্ঘদিন তাঁর টিকে থাকাই ছিল বিস্ময়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের চুক্তি হয়েছে, নাকি সমঝোতা

আমরা একদিন পশ্চিমা ‘হিপোক্রেসি’ মিস করব—সেই দিন কবে

জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের আকাশচুম্বী চাহিদা: অর্থসংকটে উৎপাদন কীভাবে বাড়াবে পাকিস্তান

বেলুচিস্তান থেকে বাংলাদেশ: কেন বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করছে পাকিস্তান

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের উদ্বেগ, চীনের হিসাব-নিকাশ, পাকিস্তানের সুযোগ