চলতি বছর একের পর এক সংকট পার করছে ইরানিরা। জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী আন্দোলন নির্মমভাবে দমন এবং মাস দুয়েকের মধ্যেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বোমা হামলায় ইরানিদের সাধারণ জীবন প্রায় তছনছ হয়ে গেছে। যদিও সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে অনেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে তাঁদের।
ইরানের কট্টরপন্থী সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘন, বাকস্বাধীনতা রোধ, পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিসহ বহু কারণে দেশটির ওপর কয়েক দশক ধরে আছে পশ্চিমা অবরোধ। এসবের জেরে দিনে দিনে ধসে পড়তে থাকে দেশটির অর্থনীতি। গত ডিসেম্বরে দেশটির মুদ্রার ব্যাপক দরপতন হলে শুরু হয় তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৪০ দিন ধরে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশটির হাজার হাজার ভবন। দেশজুড়ে অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জানুয়ারিতে যে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিন্তন সংস্থা ‘ডন’-এর বিশ্লেষক ওমিদ মেমারিয়ান বলেন, ইরানিরা বুঝেছে এই যুদ্ধ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে না, কিন্তু তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে দেবে। সেনাবাহিনীও আগের মতোই কাজ করবে এবং পরিস্থিতি রক্তক্ষয়ী হবে।
এদিকে প্রায় ৪০ দিনের যুদ্ধেও ইরানের কট্টরপন্থী সরকারের পতনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নিঃসন্দেহে সরকার অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে, কিন্তু বিরোধী মত কঠোর হাতে দমনের পন্থা থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা আছে বলে ইরানিরা বিশ্বাস করে না। তীব্র বোমাবর্ষণে টিকে থাকার পর এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মাধ্যমে ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ভেতর নিয়ন্ত্রণ এখনো ধরে রেখেছে।
জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ৩৭ বছর বয়সী ফারিবা বলেন, ‘যুদ্ধ শেষের পরই আমাদের প্রকৃত সমস্যা শুরু হবে। আমি খুব ভয় পাচ্ছি, যদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছায়, তাহলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়াবে। মানুষ যেমন জানুয়ারির দমন-পীড়নের কথা ভুলে যায়নি, আর সরকারও মনে রেখেছে যে, মানুষ তাদের চায় না। যুদ্ধকালে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এড়াতে তারা এখন কিছু বলছে না।
২৭ বছর বয়সী শিক্ষক সারা বলেন, ‘এখন মানুষ যুদ্ধবিরতির কারণে কিছুটা স্বস্তিতে আছে—কিন্তু এরপর কী হবে? এমন এক সরকারের সঙ্গে আমরা কীভাবে চলব, যা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।’
উত্তর তেহরানের বাসিন্দা ৪৩ বছর বয়সী আরজাং বলেন, এখন অনেক নারী কঠোর পোশাকবিধির দমন থেকে মুক্ত আছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তির পর এই সাধারণ স্বাধীনতাটুকুও থাকবে কি না, তা অনিশ্চিত। বহিরাগত চাপ কমে গেলে, সরকার অবশ্যই আবার কঠোর হয়ে উঠবে।
প্রসঙ্গত, ইরানের সরকার পোশাকবিধির নামে নারীদের ওপর কঠোর আইন প্রয়োগ করে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো, পুলিশ হেফাজতে মাহশা আমিনি নামে এক ২২ বছরের তরুণীকে হত্যা, যাকে আটক করা হয়েছিল, হিজাব দিয়ে মাথার চুল পুরোপুরি না ঢাকার কারণে।
সবশেষ জানুয়ারির বিক্ষোভ ছিল ইরানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় গণ-আন্দোলন। তবে এতে মানুষের জীবনে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। বরং কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, যা ব্যবসা ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধাক্কা। আবার সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিলে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা পাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
ডনের বিশ্লেষক মেমারিয়ান বলেন, যুদ্ধ শেষ হলে এবং মানুষ ‘বিশ্বাসঘাতক’ তকমা পাওয়ার ভয় কমে গেলে জন-অসন্তোষ আবার বাড়তে পারে। মানুষের মনে তুষের আগুন এখনো জ্বলছে।