নয়াদিল্লিতে সমাপ্ত হওয়া ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দুই দিনের সম্মেলন কোনো যৌথ ইশতেহার ছাড়াই শেষ হয়েছে। আয়োজক দেশ ভারত একটি ‘চেয়ারম্যান স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করলেও, জোটের ১০টি সদস্য দেশের মধ্যে ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে। চীন উচ্চ পর্যায়ের কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস-এর সম্প্রসারণ বা ‘ব্রিকস+’ মডেল কার্যকর হওয়ার পর এটিই জোটের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ব্যর্থতা।
সম্মেলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত মুহূর্ত তৈরি হয় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাগ্যুদ্ধে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ব্রিকসকে অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, একটি সদস্য দেশ (পরোক্ষভাবে আরব আমিরাতের দিকে ইঙ্গিত করে) যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় যৌথ বিবৃতির খসড়ায় বাধা দিয়েছে। আরাঘচি সাফ জানান, তাঁদের লক্ষ্য কেবল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, কিন্তু সেই ঘাঁটিগুলো প্রতিবেশী দেশের মাটিতে থাকায় জটিলতা বাড়ছে।
জবাবে আরব আমিরাতের প্রতিনিধি খলিফা বিন শাহীন আল মারার এই বক্তব্যকে ‘সন্ত্রাসবাদের অজুহাত’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, গত ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান তাদের ওপর ৩ হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এটি কোনোভাবেই একটি বন্ধুসুলভ বা জোটভুক্ত দেশের আচরণ হতে পারে না।
গাজা নিয়ে সদস্য দেশগুলো ইসরায়েলের ‘গণহত্যামূলক’ সামরিক অভিযানের নিন্দা জানালেও, সেখানেও পূর্ণ ঐকমত্য মেলেনি।
গাজা ও পশ্চিম তীরকে একীভূত করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে সবাই একমত হলেও একটি নাম না জানা দেশ কিছু নির্দিষ্ট শব্দপ্রয়োগে আপত্তি জানায়।
লেবাননে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও সদস্য দেশগুলো একে ‘নামমাত্র যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে সমালোচনা করেছে।
এদিকে সম্মেলনে শেষে যৌথ বিবৃতি না এলেও ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সারসংক্ষেপে কিছু দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে:
১. জাতিসংঘের সংস্কার: ব্রিকস দেশগুলো আবারও দাবি তুলেছে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলোর জন্য স্থায়ী সদস্যপদের দাবি পরোক্ষভাবে সমর্থিত হয়েছে।
২. অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন: ডলারে নির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের পাশাপাশি পশ্চিমের চাপিয়ে দেওয়া ‘একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা’র বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সুদান পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে অস্ত্রবিরতির ডাক দেওয়া হয়েছে। জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়েও মন্ত্রীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে।
এ ছাড়া আসাদ পরবর্তী সিরিয়ায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক উত্তরণ এবং ‘বিদেশি সন্ত্রাসী’ নির্মূলের বিষয়ে একমত হয়েছেন প্রতিনিধিরা।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস এখন একটি বিশাল কিন্তু অসংলগ্ন জোটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আয়োজক হিসেবে ভারত চেষ্টা করলেও চীন ও রাশিয়ার নিজস্ব এজেন্ডা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সদস্যদের (ইরান বনাম আরব আমিরাত/সৌদি আরব) পারস্পরিক তিক্ততা জোটের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ব্রিকসের এই ব্যর্থতা পশ্চিমা শক্তিগুলোকে একটি বার্তা দিচ্ছে যে, ‘গ্লোবাল সাউথ’ এখনো ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্ব ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে উঠতে প্রস্তুত নয়।
নয়াদিল্লির এই সম্মেলন প্রমাণ করল, কেবল সদস্য সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের দেশের মধ্যে একটি সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচি তৈরি করা ব্রিকসের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যৌথ বিবৃতিহীন এই সমাপ্তি জোটের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিল।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স